প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একসঙ্গে মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার রামজয়পুর গ্রামের চার তরুণ উদ্যোক্তা। নিজেদের সঞ্চয় ও ধার করা অর্থ মিলিয়ে পুকুর লিজ নিয়ে শুরু করেছিলেন মাছের ব্যবসা। দীর্ঘদিনের পরিচর্যা আর পরিশ্রমের পর যখন মাছ বিক্রির সময় ঘনিয়ে এসেছিল, তখনই ঘটল ভয়াবহ বিপর্যয়। রাতের আঁধারে পুকুরে বিষ প্রয়োগের অভিযোগে মারা গেছে প্রায় ৯০ মণ মাছ। এতে প্রায় ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা।
ঘটনার পর থেকে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চার তরুণ। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করা হয়েছে। এতে তাদের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ যেমন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার যে স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন, এক রাতের ঘটনায় তা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চার উদ্যোক্তা হলেন মাজহারুল ইসলাম অপু, সাইফুল ইসলাম সম্রাট, রাহাত আলী ও তানজীর আহমেদ মানিক। তারা যৌথভাবে রামজয়পুর গ্রামের একটি পুকুর বছরে এক লাখ টাকা লিজ নেন। এরপর পুকুরটি মাছ চাষের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেখানে প্রায় চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। রুই, কাতলা, পাঙাশ, সিলভার কার্পসহ সাত থেকে আট ধরনের মাছের পোনা ছাড়েন তারা।
মাছগুলো বড় করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়েছে। খাবার দেওয়া, পানির মান ঠিক রাখা, পুকুরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণসহ নানা কাজে সময় ও অর্থ ব্যয় করেছেন তারা। ধীরে ধীরে মাছগুলো বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠছিল। উদ্যোক্তাদের আশা ছিল, মাছ বিক্রি শুরু হলে প্রথমে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে, এরপর লাভের মুখ দেখবেন তারা। সেই প্রত্যাশার সময় যখন প্রায় চলে এসেছিল, তখনই পুকুরে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটে।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা পুকুরের পানিতে বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করে। বিষয়টি তারা বুঝতে পারেন পরদিন সকালে পুকুরে গিয়ে। পানিতে অসংখ্য মাছ ভেসে থাকতে দেখে প্রথমে তারা হতবাক হয়ে যান। পরে পুকুরের বিভিন্ন অংশে বিপুলসংখ্যক মৃত মাছ দেখতে পান। পরিস্থিতি দেখে তাদের ধারণা হয়, পানিতে কোনো বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগের কারণেই মাছগুলোর মৃত্যু হয়েছে।
পরে হিসাব করে তারা দেখতে পান, পুকুরে থাকা প্রায় ৯০ মণ মাছ মারা গেছে। মাছের পরিমাণ ও বাজারমূল্য বিবেচনায় তাদের প্রায় সাত লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। এর বাইরে পুকুর লিজ নেওয়া, মাছের পোনা কেনা, খাবার, পরিচর্যা ও অন্যান্য খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেই বিনিয়োগের বড় অংশও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
চার উদ্যোক্তার জন্য ঘটনাটি শুধু আর্থিক ক্ষতির নয়, মানসিকভাবেও বড় আঘাত। তারা জানিয়েছেন, অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করার লক্ষ্যেই মাছ চাষে নেমেছিলেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর যখন ব্যবসা থেকে আয় করার সময় এসেছিল, তখন এমন ঘটনা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে কঠিন অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।
স্থানীয়ভাবে মাছ চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক তরুণ কৃষি ও মৎস্য খাতকে নিজেদের কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে তারা একদিকে নিজেদের আয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহেও ভূমিকা রাখেন। কিন্তু মাছ নিধনের মতো ঘটনা উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এটি স্বাভাবিকভাবে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে পুকুরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে কে বা কারা এ ঘটনায় জড়িত, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং পুকুরে ঠিক কী ধরনের পদার্থ প্রয়োগ করা হয়েছিল—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার কথা।
উদ্যোক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, পুকুরে বিষ প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার বিষয়ে শৈলকূপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফলে এখন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দিকে নজর রয়েছে।
একটি পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের ঘটনা বাইরে থেকে দেখলে হয়তো কেবল সম্পদের ক্ষতি হিসেবে মনে হতে পারে। কিন্তু এই চার তরুণের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কয়েক মাসের শ্রম, বিনিয়োগ, প্রত্যাশা এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। একটি ছোট উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তারা যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছিলেন, মুহূর্তের মধ্যে সেই পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মাছগুলো বিক্রি করে তারা যে অর্থ পাওয়ার আশা করেছিলেন, তা দিয়ে হয়তো বিনিয়োগের টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে মাছ চাষে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনাও ছিল। এখন নতুন করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের সামনে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। ক্ষতির পাশাপাশি পুকুরে পুনরায় মাছ চাষ শুরু করতে হলে আবারও বিনিয়োগ করতে হবে, যা তাদের জন্য সহজ হবে না।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাই নয়, স্থানীয়ভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহী তরুণদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। কারণ, সীমিত পুঁজি নিয়ে যারা কৃষি, মৎস্য বা ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, তাদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
রামজয়পুরের এই চার তরুণের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাদের ক্ষতির প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘদিনের শ্রমে গড়ে তোলা মাছের খামার এক রাতেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা তাই শুধু একটি পুকুরের মাছ নিধনের ঘটনা নয়; এটি গ্রামীণ পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম ও ঝুঁকিরও একটি প্রতিচ্ছবি। চার তরুণের আশা এখন একটাই—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক এবং তারা যেন আবার নতুন করে নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করতে পারেন।