র‍্যাবের অধ্যায় শেষ, এসআরবির নতুন যাত্রা শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
র‍্যাবের অধ্যায় শেষ, এসআরবির নতুন যাত্রা শুরু

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ের পথচলার পর র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব নামে পরিচিত বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শেষ হয়েছে। নতুন কাঠামো ও নতুন নামে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে বিশেষায়িত এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নামে কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছেন বাহিনীটির প্রধান আহসান হাবীব পলাশ।

বাহিনী প্রধান জানিয়েছেন, এসআরবি নামে গেজেট জারি হয়েছে এবং র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন নামেই সব কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। নতুন পরিচয়ের সঙ্গে বাহিনীর লোগোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র এবং বিভিন্ন ইউনিটের বিজ্ঞপ্তিতে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ লেখা নতুন পরিচিতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে লোগোর মূল নকশায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

র‍্যাবকে বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে র‍্যাবের পরিবর্তে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়। পরে বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গুরুতর অপরাধ দমন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি আধুনিক, দক্ষ, বিশেষায়িত ও জবাবদিহিমূলক ইউনিট প্রয়োজন। নতুন আইনের কাঠামোয় এসআরবিকে পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে র‍্যাবের বিদ্যমান জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, সম্পদ, রেকর্ড, চুক্তি ও দায়-দায়িত্বের বড় অংশ নতুন কাঠামোর আওতায় স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে নাম ও আইনি কাঠামোর পরিবর্তন হলেও বিদ্যমান সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নতুন বাহিনীর কাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা উপকরণ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ হঠাৎ করে বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়; এসব সম্পদ নতুন ব্যবস্থার অধীনেই কাজে লাগানো হবে।

এসআরবির দায়িত্ব ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়েও আইনে বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বাহিনীটি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের মতো আইনগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। পাশাপাশি নিজস্ব আটককক্ষ, মালামাল সংরক্ষণ ও জিজ্ঞাসাবাদ-সংক্রান্ত সুবিধা রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাহিনীটির নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি বা তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

নতুন বাহিনীকে ঘিরে জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসআরবি আইনে সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, নতুন কাঠামোয় শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও তদন্তের জন্য আগের ব্যবস্থার তুলনায় সুস্পষ্ট কাঠামো থাকবে। তবে নতুন বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আইনি জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

র‍্যাবের ইতিহাস বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০৪ সালে বাহিনীটি গঠনের পর সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা করে। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে। এসব অভিযোগের কারণে দেশ-বিদেশে র‍্যাবের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং বাহিনীর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তী সময়ে র‍্যাবের কাঠামো ও কার্যক্রম সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাহিনীটি বিলুপ্ত করার দাবিও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক মহল থেকে সামনে আসে।

র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া অবশ্য শুরু থেকেই বিতর্কমুক্ত ছিল না। সংসদে বিল উত্থাপনের সময় বিরোধী সদস্যদের কেউ কেউ র‍্যাব বিলুপ্তির সঙ্গে নতুন বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, শুধু নাম পরিবর্তন বা বিদ্যমান জনবল ও কাঠামো স্থানান্তর করলে আগের সমস্যাগুলোর সমাধান নাও হতে পারে। নতুন বাহিনী গঠনের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসআরবি র‍্যাবের হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়; বরং নতুন আইন ও কাঠামোর মাধ্যমে একটি আধুনিক এবং জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলাই লক্ষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও বিদ্যমান সক্ষমতা নষ্ট না করে সেগুলোকে নতুন ব্যবস্থায় কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এই পরিবর্তনের ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটল। র‍্যাবের পরিচিতি, পোশাক, লোগো ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন বাহিনীর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিই এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে অপরাধ দমন ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, আইনানুগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির ভারসাম্য বজায় রাখা এসআরবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

র‍্যাবের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম থেকে তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এসআরবির কাজে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিও নতুন ব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাহিনীর জন্য কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হবে।

১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নামে কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে তাই শুধু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন হয়নি; বাংলাদেশের বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। র‍্যাবের পরিচিতি এখন অতীতের অংশ হলেও তার জনবল, সম্পদ ও অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ নতুন এসআরবির কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে। আগামী দিনগুলোতে নতুন বাহিনী কীভাবে তার আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করে, কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় কী ভূমিকা রাখে—সেটিই এই রূপান্তরের বাস্তব মূল্যায়নের প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত