প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে দেশটির লেবার সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই পরিকল্পনা আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুযোগ সীমিত করা, অস্থায়ী ভিসার সংখ্যা কমানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশত্যাগ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজিং ভিসায় অবস্থানের সুযোগ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে টনি বার্কের নির্ধারিত ভাষণের শিরোনাম রাখা হয়েছে—‘দ্য ওয়ার্ক অব ম্যানেজিং দ্য মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম: হু অ্যারাইভস, হু স্টেইস, হু লিভস’। অর্থাৎ অভিবাসন কর্মসূচির ব্যবস্থাপনায় কারা অস্ট্রেলিয়ায় আসবেন, কারা থাকবেন এবং কারা চলে যাবেন—মূলত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামীকালের ঘোষণায় তুলে ধরার কথা রয়েছে।
গত মাসেই এই নীতি ঘোষণা করার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভার ভেতরে পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে শেষ মুহূর্তে টনি বার্কের নির্ধারিত ভাষণ স্থগিত করা হয়। পরে পরিকল্পনাটি সংশোধন করা হয় এবং চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিসভার ব্যয় পর্যালোচনা কমিটি এতে অনুমোদন দিয়েছে বলে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে আগামীকালের ঘোষণাকে দেশটির অভিবাসন নীতির পরবর্তী ধাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন পরিকল্পনার সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগ। বর্তমানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাদের স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীল সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটি মোট ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭টি শিক্ষার্থী ভিসা দিয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৯৯১টি ভিসা ছিল শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল বা পরিবারের সদস্যদের জন্য। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সরাসরি কমানোর বদলে তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত করার দিকে সরকার বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন কার্যকর হলে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার পরিকল্পনা করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য ভিসার নতুন শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে ঠিক কোন ধরনের শিক্ষার্থী, কোন ভিসা এবং কোন পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে কী বিধিনিষেধ কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য আগামীকালের ঘোষণার আগে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
সরকারের আরেকটি বড় লক্ষ্য অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। অস্ট্রেলিয়ায় অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে। সরকারের দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি করছে এমন একটি প্রবণতা হলো, একজন ব্যক্তি একটি অস্থায়ী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্য ধরনের ভিসায় আবেদন করে দীর্ঘ সময় দেশটিতে অবস্থান করছেন। এক ভিসা থেকে আরেক ভিসায় যাওয়ার এই প্রবণতাকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতির আলোচনায় ‘ভিসা হপিং’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী অবস্থান সীমিত করার উদ্যোগ থাকতে পারে।
অভিবাসন কমানোর বৃহত্তর লক্ষ্যও এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা NOM—অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে দেশটিতে আসা এবং দেশ ছাড়ার মানুষের সংখ্যার পার্থক্য—২০২৫ সালে প্রায় ৩ লাখ ১ হাজারে ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহামারির পরের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে সরকার আগামী কয়েক বছরে এটিকে আরও কমিয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে।
এই লক্ষ্য পূরণে অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের যুক্তি হলো, অস্থায়ী ভিসাধারীদের সংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাসময়ে দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে যেসব ব্যক্তি একের পর এক ভিসা পরিবর্তনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করেন, তাদের জন্য নিয়ম আরও কঠোর হতে পারে।
ব্রিজিং ভিসা ব্যবস্থাও সরকারের নজরে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় কোনো ব্যক্তি ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পর্যালোচনা বা আপিলের প্রক্রিয়ায় থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্রিজিং ভিসায় দেশটিতে অবস্থানের সুযোগ পান। এই ব্যবস্থার আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ব্রিজিং ভিসাধারীর সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার ৪৫০ থেকে বেড়ে ৪ লাখ ১৩ হাজারে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে করা প্রোটেকশন ভিসার আবেদনের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৮০টি এ ধরনের আবেদন জমা পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আবেদনের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রত্যাখ্যাত হলেও আবেদনকারীরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও ফেডারেল কোর্টে পর্যালোচনার সুযোগ পান। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্রিজিং ভিসার আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করতে পারেন।
তবে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে মানবিক ও আইনি প্রশ্নও রয়েছে। কোনো ব্যক্তির সুরক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি যদি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় যান, তখন তার কাজের অধিকার সীমিত করা বা অবস্থানের সুযোগ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত তার জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সরকার কীভাবে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আইনগত পর্যালোচনার অধিকার এবং মানবিক বিবেচনার ভারসাম্য রাখে, সেটিও আগামীকালের ঘোষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষ কর্মী ভিসা ব্যবস্থাতেও ইতোমধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুলাইয়ে টনি বার্ক দক্ষ ভিসা প্রক্রিয়াকরণের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আনেন। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে আবেদন করা কিছু দক্ষ কর্মীর আবেদন অপেক্ষাকৃত নিচের অগ্রাধিকারে চলে যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ অস্থায়ী দক্ষ ভিসার সাধারণ প্রক্রিয়াকরণ সময় ছিল প্রায় ৯৮ দিন, যদিও অগ্রাধিকার, আবেদনের ধরন ও নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে সময়ের বড় পার্থক্য হতে পারে।
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন নিয়ে ব্যবসায়ী ও খনি খাতের সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, শ্রমিক সংকটে থাকা বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীর প্রবেশ অতিরিক্ত সীমিত হলে উৎপাদন, অবকাঠামো নির্মাণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারের পক্ষ থেকেও অবশ্য বলা হচ্ছে, অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করাও তাদের পরিকল্পনার অংশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক জুনে জানিয়েছিলেন, সরকার এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা চায় যেখানে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের অস্ট্রেলিয়ায় আনার বিষয়টি বজায় থাকবে, একই সঙ্গে অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহারও কমানো হবে।
এ কারণে আগামীকালের ঘোষণাকে শুধু ভিসা কমানোর পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়ার সরকার একদিকে অভিবাসনের সামগ্রিক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের সেবা, নির্মাণ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর খাতে প্রয়োজনীয় কর্মী সরবরাহ বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সরকার ইতোমধ্যে ২০২৮ সালের মধ্যে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শিক্ষার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্যও ঘোষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য যান। তাদের অনেকে ভবিষ্যতে কাজ, স্থায়ী বসবাস বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকার পরিকল্পনা করেন। নতুন নিয়মে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য ভিসা কাঠামো পরিবর্তিত হলে এসব পরিকল্পনায় নতুন করে হিসাব করতে হতে পারে।
তবে এখনো পর্যন্ত যেসব পরিবর্তনের কথা সামনে এসেছে, তার বড় অংশই প্রত্যাশিত বা বিবেচনাধীন নীতি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। কোন প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে, কোন ভিসায় কী শর্ত যুক্ত হবে এবং পরিবর্তনগুলো কখন থেকে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য আগামীকাল টনি বার্কের ঘোষণার পরই পাওয়া যাবে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার চেষ্টা করবে। সংসদীয় সমর্থন পাওয়া না গেলে সরকারের হাতে থাকা অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হতে পারে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, কাজ বা পরিবারের সঙ্গে বসবাসের পরিকল্পনা করা বিদেশিদের জন্য আগামীকালের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন নীতির মাধ্যমে কারা প্রবেশের সুযোগ পাবেন, কারা দীর্ঘদিন থাকতে পারবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন, ব্যবসায়িক চাহিদা, আইনি অধিকার ও মানবিক বিবেচনার মধ্যে সরকার কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করে, সেটিও নজরে থাকবে।