প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর হাতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন হুতিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের সামরিক অগ্রগতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের পেরিম দ্বীপ, যা ময়ুন নামেও পরিচিত, হুতি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ইয়েমেনের সরকারি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, একই সময় বাব আল-মানদেবের কাছাকাছি ধুবাব এলাকাতেও হুতিদের অগ্রগতি ঘটে। পেরিম দ্বীপের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বীপটি বাব আল-মানদেব প্রণালির মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নজরদারি বা চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জানান, ওয়াশিংটন শুধু সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে না, হুতিদের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ রাখছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করছে। তিনি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ভ্যান্সের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, বর্তমান পরিস্থিতিকে ওয়াশিংটন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেন ও আশপাশের পরিস্থিতি খুব দ্রুত এবং নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।
হুতিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এরপর ইয়েমেনে সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কমে এলেও রাজনৈতিক সমাধান স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের নতুন করে উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হওয়া এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার কারণে সংঘাত আবারও আঞ্চলিক মাত্রা পাচ্ছে।
পেরিম দ্বীপের গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানে। বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর উত্তর দিকে রয়েছে সুয়েজ খাল, যা এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে এই সরু জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচলে বাধা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প দীর্ঘ নৌপথ ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতির আগে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখার নিয়ন্ত্রণও নেয়। এর ফলে পেরিম দ্বীপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন অবস্থানে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অগ্রগতি বাব আল-মানদেবের আশপাশে নৌ চলাচলের ওপর হুতিদের সম্ভাব্য প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের ওপরও যদি দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়, তাহলে জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে দেশটি লোহিত সাগরমুখী বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে শুরু করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের অগ্রগতি ও নতুন করে সহিংসতা বাড়ায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ দক্ষিণাঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এক লাখের বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিরাপদ জায়গার সন্ধানে ঘর ছাড়ছে।
এই মানবিক সংকটের পাশাপাশি সৌদি আরবের ওপরও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হুতিদের সৌদি ভূখণ্ডের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা উঠে এসেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
পেরিম দ্বীপের দখল তাই শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন। ওয়াশিংটনের জন্যও পরিস্থিতি জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিজের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণেই হুতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হুতিদের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। আলোচনায় কী বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, কারা এতে অংশ নিচ্ছেন কিংবা এর কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো সীমিত তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে ভ্যান্সের বক্তব্য থেকে এটুকু স্পষ্ট যে ওয়াশিংটন হুতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে, তবে সেই যোগাযোগকে পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা বা কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি।
এদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের সামরিক গতিপথ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেরিম দ্বীপ ও বাব আল-মানদেবকে ঘিরে হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর হলে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পেরিম দ্বীপের দখল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন—তিনটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।