প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রচারিত কিছু তথ্য ও গুজবকে ভিত্তি করে দুদক অভিযোগ গ্রহণ করায় প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, কয়েক মাস আগে রাজনৈতিকভাবে প্রচারিত কিছু বক্তব্য বা তথ্যকে অভিযোগ হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে দুদককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে নাহিদের এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; এগুলো দুদকের বিরুদ্ধে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ২ সেপ্টেম্বর দুদক জানায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতি ঘিরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারসংক্রান্ত আরও অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতেই অনুসন্ধান পরিচালনা করা হচ্ছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর বিষয়টি নিয়ে এর আগেও আসিফ মাহমুদ নিজে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে দুদকের কর্মকর্তারা অভিযোগগুলোকে অনুসন্ধানের যোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে বিষয়টি এখন মূলত অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তদন্তের প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হওয়া নিজেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না।
নাহিদ ইসলাম তাঁর বিবৃতিতে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে দুদককে ব্যবহারের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অতীতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ও তদন্তকে রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগে ব্যবহারের যে বিতর্ক ছিল, বর্তমান ঘটনাকে তিনি সেই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের কাঠামোগত স্বাধীনতা ও সংস্কার নিয়ে। নাহিদ ইসলামের দাবি, জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সেই কাঠামোগত সংস্কারের প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি।
নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর দাবি, বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং কমিশনের কাঠামোগত সংস্কার না হওয়া প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তবে এসব বক্তব্য নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বা প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, জুলাই সনদের আলোকে পুনর্গঠিত কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন যদি আসিফ মাহমুদ বা দলের অন্য কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করে, তাহলে তাঁর দল সেই তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কমিশনকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নাহিদ ইসলাম একদিকে তাঁর দলের নেতার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থান জানিয়েছেন, অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে তাদের আপত্তি নেই; আপত্তি রয়েছে তদন্তের প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের পরিধিও এরই মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে বদলি ও পদায়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের মতো অভিযোগের কথা এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কিছু বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর কোনোটিই আদালত বা অনুসন্ধানকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পর্যায়ে নেই।
দুদকের সচিবের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের উপযোগী হওয়ায় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অর্থপাচারসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তথ্য চাওয়া হতে পারে বলেও দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর অর্থ হলো, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক নথি, সংশ্লিষ্ট লেনদেন এবং অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া সামনে এগোতে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনাকে ঘিরে মূল বিতর্ক এখন দুটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত। প্রথমত, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি ও সত্যতা কী। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান পরিচালনার ক্ষেত্রে দুদক কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করছে। এই দুই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত অনুসন্ধানের নথি, প্রমাণ এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।
দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিক নেতা অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বললে সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে দুদক কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলে সেটিও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। অনুসন্ধানের পর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে; আবার প্রমাণ না মিললে অভিযোগের কার্যক্রম সেখানেই থেমে যেতে পারে।
নাহিদ ইসলাম তাঁর বিবৃতির শেষ দিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। একই সঙ্গে জুলাই সনদের আলোকে স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকায় সামনে আরও তথ্য প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিযোগগুলোর নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করবে। রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর ও আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হয়—সেটিই এখন এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।