বিধিমালা বদলালে কমতে পারে ফ্ল্যাটের দাম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
বিধিমালা বদলালে কমতে পারে ফ্ল্যাটের দাম

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসন ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার সময়ে গৃহায়ণ খাতের বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এমপি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেছেন, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এবং নগর গৃহায়ণ বিধিমালা আইনি রূপ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বিধিমালা সংশোধিত হলে আবাসন প্রকল্পে ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক কম দামে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

সোমবার জাতীয় সংসদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে আবাসন খাতের বিদ্যমান কিছু বিধিনিষেধ, বিশেষ করে ভবন নির্মাণ ও জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি উঠে আসে।

শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল জানান, ড্যাপ বিধিমালা এবং নগর গৃহায়ণ বিধিমালা—দুটি বিধিমালাই বর্তমানে আইনি রূপ পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তিনি আশা করছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরবর্তী সভার আগেই সংশোধিত বিধিমালা পাস হতে পারে। তাঁর মতে, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে আবাসন খাতে বিদ্যমান কিছু জটিলতা কমবে এবং একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে অধিকসংখ্যক আবাসিক ইউনিট নির্মাণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আবাসন ব্যয়ের সঙ্গে জমির মূল্য, নির্মাণ ব্যয় এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জমির দাম বেশি হওয়ায় একটি আবাসিক প্রকল্পে জমির ব্যয় বড় অংশ দখল করে থাকে। ফলে নির্মাণযোগ্য ইউনিটের সংখ্যা ও ভবনের কাঠামো নির্ধারণে বিধিমালার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট বিধিতে অনুমোদিত নির্মাণের পরিমাণ বাড়লে একই প্রকল্পে বেশি ফ্ল্যাট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এতে প্রতি ইউনিটের ওপর জমির ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকে।

শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, আগের নগর বিধিমালার কিছু আইনি জটিলতার কারণে আবাসন ও ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর-সংক্রান্ত নিয়মের জটিলতার কারণে অনেক ল্যান্ড ডেভেলপার প্রত্যাশিতভাবে আবাসন প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারছেন না। বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনা করছেন বলেও তিনি জানান।

এফএআর মূলত একটি ভবনে জমির আয়তনের তুলনায় কতটুকু মোট ফ্লোর স্পেস নির্মাণ করা যাবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। একটি এলাকায় এফএআর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পরিবর্তিত হলে ভবনের আয়তন, তলা বা মোট ব্যবহারযোগ্য জায়গার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ বিধিমালায় পরিবর্তন এলে আবাসন নির্মাণের পরিমাণ এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে ফ্ল্যাটের দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর। জমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম, ঋণের সুদ, শ্রম ব্যয়, ইউটিলিটি সংযোগ এবং ডেভেলপারদের অন্যান্য ব্যয়ও আবাসনের চূড়ান্ত দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে বিধিমালা পরিবর্তনের সুফল সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে হলে আবাসন খাতের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এদিকে রাজউকের ভবন ও নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি বলেন, মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রী ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

বর্তমানে একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া এক জায়গায় এনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে।

শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল জানান, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে এক জায়গায় আবেদন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নকশা বা প্ল্যান পাওয়ার ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি স্থপতি, প্রকৌশলী, ডেভেলপার ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশাজীবীদের কাজের সময় ও ব্যয় কমতে পারে।

গৃহায়ণ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ ও বাজেট বারবার বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রকল্পগুলোর কাজ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করবে। প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে এবং কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা দুর্নীতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অযথা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার ওপর নজর রাখার কথাও তিনি জানান।

অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রাজধানী ও বিভিন্ন শহরে পরিকল্পনা অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার কারণে দীর্ঘমেয়াদে যানজট, জলাবদ্ধতা, অগ্নিঝুঁকি, পরিবেশগত সমস্যা ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়তে পারে। এ কারণে ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।

তবে যেসব ভবন নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু কোনো কারণে নকশা অনুমোদন বা প্ল্যান পাস করা হয়নি, সেসব ভবনের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রাজউকের বিধিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জরিমানা বা শাস্তির মাধ্যমে কোনো কোনো ভবন বৈধ করার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

আবাসন খাতের এই সম্ভাব্য পরিবর্তন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, ঋণের দায় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা জড়িত থাকে। নির্মাণ ব্যয় ও জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে নিজস্ব ফ্ল্যাট কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে যদি প্রকল্প ব্যয় ও নির্মাণ জটিলতা কমানো যায়, তাহলে এর সুফল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে সংশোধিত বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবে এর প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নিয়মের সুনির্দিষ্ট কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং আবাসন বাজারে তার প্রতিফলনের ওপর। ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়লেও নির্মাণ ব্যয় বা জমির মূল্য একই হারে বাড়তে থাকলে ক্রেতাদের জন্য দাম কমার সুযোগ সীমিত হতে পারে। আবার অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমে গিয়ে কিছু ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে ড্যাপ ও নগর গৃহায়ণ বিধিমালার সংশোধন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয় গৃহায়ণ খাতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর থাকবে সংশোধিত বিধিমালা কবে চূড়ান্ত হয় এবং বাস্তবে তা কীভাবে কার্যকর করা হয় তার দিকে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত নগরায়নের পাশাপাশি আবাসন যেন আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত