জ্বালানি সংকট নিয়ে সংস্কারের দাবি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
জ্বালানি সংকট নিয়ে সংস্কারের দাবি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কর্মসূচিতে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, দেশের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে সরকারকে সংস্কারের পথে যেতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে; সরকারের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের বিষয়ে পৃথক প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনের তথ্যভিত্তিতে নিশ্চিত করা যায়নি।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এসব কথা বলেন। এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এই কর্মসূচির আয়োজন করে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এতে অংশ নেন।

সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ডিজেল ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা ছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে প্রতিটি প্রধান জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সংগ্রহের ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে।

তবে এনসিপির কর্মসূচিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট রয়েছে—এটি তাঁরা অস্বীকার করছেন না। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সক্ষমতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারকে সংস্কারের পথে যেতে হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি সরকারের নীতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

এনসিপির এই নেতা আরও দাবি করেন, দলটির পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিরোধী দলগুলোর জোট থেকেও কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার এসব প্রস্তাব অনুসরণ করে সমাধানের পথে এগোয়নি।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন নাসীরুদ্দীন। তাঁর বক্তব্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিক বা মোটরসাইকেল চালকরাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; পরিবহন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে এর প্রভাব পণ্য, কৃষি, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে। বিশেষ করে উবার ও পাঠাওচালক, পরিবহন শ্রমিক এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারীদের ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়তে পারে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা এমন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরেছেন যেখানে কেউ কেউ সরকারের সমালোচনা করতেও শঙ্কা বোধ করছেন। তবে গ্রেপ্তারের আশঙ্কার এই অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো পরিসংখ্যান বা সরকারি বক্তব্য তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়নি।

সরকারের বিরুদ্ধে ‘সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতার’ অভিযোগও তোলেন নাসীরুদ্দীন। তিনি অতীতের রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তুলনা করে সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।

এনসিপির এই নেতা তাঁদের পূর্ববর্তী কর্মসূচির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দলটি আট দফা দাবিতে লং মার্চ করেছে এবং সরকারকে বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দাবির পরও সরকার প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নেয়নি। এ অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও জোরদারের ইঙ্গিত দেন তিনি।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বর্তমান সরকার ও বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনা করেন। তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনা করেন এবং বলেন, যে ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা এনসিপি বলছে, তা বাস্তবায়ন না হলে সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এসব মন্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, জনগণের সামনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিও সামনে আসে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কারের পরিবর্তে পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বহাল থাকলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাসীরুদ্দীন। সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এসব ব্যাখ্যার সমালোচনা করেন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় মেটাতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেসব যুক্তি সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কর্মসূচিতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। জ্বালানির দাম পরিবহন খরচের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর বাজারে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার কথাও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে, এনসিপির কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলটি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম ইস্যু হিসেবে সামনে আনছে। এর আগে দলটির পক্ষ থেকে ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সোমবার রাতে সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

রাত ৮টার দিকে বাংলামোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পাশাপাশি এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার, জাতীয় যুবশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ সোহেল, জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক ঋআজ মোর্শেদসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। মিছিলটি পরীবাগ এলাকায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এনসিপির এই কর্মসূচি এমন সময়ে হলো, যখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতি, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন অর্থনীতি ও রাজনীতির উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এনসিপি সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সংস্কার ও জবাবদিহির দাবি তুলেছে।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের বাস্তব সমাধানে আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ ভোক্তা, পরিবহন খাত ও ব্যবসায়ীদের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়ে এবং সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তা সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত