৪৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
চার দশক পেরিয়েও গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে জনবল, শয্যা ও সরঞ্জাম সংকট রয়ে গেছে। আধুনিক ভবনও পুরোপুরি চালু হয়নি এখনও।

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাইবান্ধা জেলার প্রায় ২৭ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরকারি এই হাসপাতালটিই অনেক সময় চিকিৎসার শেষ আশ্রয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটি এখনো প্রয়োজনীয় জনবল, শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর দিক থেকে পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের একদিকে যেমন শয্যা সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অনেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

১৯৮৪ সালে মাত্র ৫০ শয্যা নিয়ে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর এটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। পরে ২০১৮ সালের ৮ মে ২০০ শয্যা এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। কাগজে-কলমে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে সেই অনুপাতে জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম যুক্ত হয়নি। ফলে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরেই ১০০ শয্যার জনবল কাঠামোর ওপর নির্ভর করে সেবা দিয়ে আসছে।

হাসপাতালের সর্বশেষ জনবলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১০০ শয্যার হিসাবেই চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে ২০৮ জন থাকার কথা। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩০ জন। অর্থাৎ ৭৮টি পদ এখনো শূন্য। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে প্রয়োজনীয় জনবল বিবেচনা করলে ঘাটতির পরিমাণ আরও বড় হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় সংকটের প্রভাব সরাসরি চিকিৎসাসেবায় পড়ছে।

চক্ষু, কার্ডিওলজি, অ্যানেস্থেশিয়া, চর্ম ও যৌন, নাক-কান-গলা, অর্থো সার্জারি, অর্থোপেডিক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। এসব বিভাগে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে রংপুরসহ অন্যত্র উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হয়।

শুধু জনবল নয়, শয্যা সংকটও হাসপাতালটির নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের আন্তঃবিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগীদের বারান্দা, করিডোর ও সিঁড়ির পাশে জায়গা করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে রোগী রাখা হয়েছে। রোগীর সঙ্গে থাকা একাধিক স্বজনের কারণে সংকীর্ণ জায়গায় আরও ভিড় তৈরি হচ্ছে। এতে রোগী ও চিকিৎসাকর্মী উভয়ের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় কিশোর তৌসিফের পরিবারের অভিজ্ঞতায়। শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর মা স্নিগ্ধা রহমান জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ ও নার্সদের সেবায় তাঁর সন্তানের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শয্যা না পাওয়ায় তাঁকে মেঝেতে জায়গা করে থাকতে হয়েছে। অর্থাৎ চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে রোগীর স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

হাসপাতালের নার্সিং বিভাগের কর্মীরাও রোগীর চাপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সিনিয়র স্টাফ নার্স স্বপ্না রানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭১ জন এবং সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০১। এই সংখ্যা হাসপাতালের বিদ্যমান জনবলের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সীমিত জনবল দিয়ে এত বেশি রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

চিকিৎসকদের ওপরও রোগীর চাপ বাড়ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক শেখ সুলতান আহমেদ সোহেল জানান, বহির্বিভাগে কখনো একজন চিকিৎসককে দিনে দেড়শ থেকে ২০০ বা তারও বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা গেলে চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।

হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের তথ্যও রোগীর চাপের একটি ধারণা দেয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে আন্তঃবিভাগে ৩৬ হাজার ১৬৭ রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগ থেকে ২ হাজার ৬৪৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩২৫ জনের। এর বাইরে জরুরি বিভাগ থেকেও গুরুতর ও আশঙ্কাজনক রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জনবল ও চিকিৎসা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ জন রোগীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। তবে কোন রোগে কতজনকে রেফার করা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত রেকর্ড জরুরি বিভাগে পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার বীনাপানি গোলদারের ভাষ্য, চিকিৎসক সংকটের কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠাতে হয়। বিশেষ করে মেডিসিন, হৃদ্‌রোগ, শিশু, ডায়রিয়া ও গাইনি বিভাগের রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

চিকিৎসা সরঞ্জামের অবস্থাও হাসপাতালের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। হাসপাতালের স্টোর কিপারের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি অটোক্লেভ মেশিনের মধ্যে একটি চালু রয়েছে। পাঁচটি অ্যানেস্থেশিয়া মেশিনই অচল। তিনটি অটো টেবিল মেশিনের পাশাপাশি চারটি অটো লাইট মেশিনের একটিও অচল রয়েছে। এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ১০০০ এমএ ও ৫০০ এমএ ক্ষমতার দুটি এবং একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চালু রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে নতুন নয়তলা ভবনটি নিয়ে। প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যার আধুনিক এই ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলের শুরুতে গণপূর্ত বিভাগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করে। কিন্তু চার বছর পার হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে ভবনটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।

নতুন ভবনটি পুরোপুরি চালু হলে পুরোনো ভবনের ওপর চাপ অনেকটাই কমতে পারে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করছে। কিন্তু এজন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদে আরও ২৭১ জন জনবল প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে নতুন ভবনের একটি অংশে টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, ফার্মেসি ও সীমিত কয়েকটি সেবা চালু রয়েছে। ভবনের বড় একটি অংশ এখনো কার্যত অব্যবহৃত।

রোগীদের জন্য নতুন ভবনের বহির্বিভাগে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা। তবে সেখানেও চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে অবকাঠামোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সহায়ক জনবল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও হাসপাতালের দীর্ঘদিনের সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গাইবান্ধার পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসার মতে, জেলার একমাত্র বড় সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধ নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য, এত বড় একটি আধুনিক ভবন বছরের পর বছর পড়ে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য হতাশাজনক।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আসিফ রহমান স্বীকার করেছেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বিদ্যমান জনবল মূলত ১০০ শয্যার কাঠামো অনুযায়ী। চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে, তবে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও সেবার মান ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় শয্যা সংকটও তীব্র হয়েছে বলে তিনি জানান।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ জানিয়েছেন, বহুতল ভবনটি বুঝে নেওয়া হলেও জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে সেটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর আশা, আধুনিক ভবনটি পুরোপুরি চালু করা গেলে হাসপাতালের বর্তমান সংকটের বড় একটি অংশের সমাধান হবে।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান চিত্র তাই শুধু একটি হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যার গল্প নয়; এটি একটি জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। চার দশকের বেশি সময় ধরে শয্যাসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুযায়ী জনবল ও সরঞ্জাম না বাড়ায় কাগজে হাসপাতালের সক্ষমতা যতটা বেড়েছে, বাস্তবে সেবার পরিধি ততটা বাড়েনি। আধুনিক ভবন নির্মাণের পরও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়া সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।

গাইবান্ধার মানুষের জন্য সরকারি এই হাসপাতালটি কেবল একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং আর্থিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসা পাওয়ার অন্যতম প্রধান আশ্রয়। তাই দীর্ঘদিনের জনবল ও সরঞ্জাম সংকট দূর করে নতুন ভবনটি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে জেলার স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। চার দশকের অপেক্ষার পর গাইবান্ধাবাসীর প্রত্যাশা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ, জনবলসমৃদ্ধ ও কার্যকর জেলা হাসপাতাল—যেখানে রোগীকে চিকিৎসার জন্য বারবার অন্য শহরে ছুটতে হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত