বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ স্পেনের ব্যবসায়ীদের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ স্পেনের ব্যবসায়ীদের

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং শিল্প ও অবকাঠামো খাতের সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দেশটিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন স্পেনের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এগ্রিবিজনেস, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও ভোগ্যপণ্য খাতে স্পেনের ব্যবসায়ী মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত এক ব্যবসায়িক সেমিনারে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সম্ভাবনাময় দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেশটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা এমন আগ্রহের কথা জানান। ‘বাংলাদেশ: এ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ইন দ্য গ্লোবাল ইকোনমি’ শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা, সবুজ বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

সেমিনারে মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলো আসেন্সিয়ো বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বাজারের আকার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

অ্যাঞ্জেলো আসেন্সিয়োর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো ছিল। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও সেমিনারে আলোচনা করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের সম্ভাবনাকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গ্রিন বিল্ডিং, পরিবহন, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, অবকাঠামো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন ডলারের সবুজ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সক্ষমতার একটি সম্ভাব্য সমন্বয়ের দিকও সামনে আসে।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, জ্বালানি রূপান্তর ও টেকসই অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের শিল্প ও নগরায়ণের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ ভবন ও জলবায়ু-স্মার্ট কৃষির মতো খাতগুলোতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে ব্যবসায়িক মহলে আলোচনা হচ্ছে।

সেমিনারে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন পণ্য ও সেবার রপ্তানি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। স্পেনসহ ইউরোপের বাজারে এসব খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, বর্তমান সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন।

তিনি জানান, এসব খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে জমি সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ও অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশের বাজারে স্পেনের ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ শুধু বিনিয়োগের পরিমাণের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; প্রযুক্তি, দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব থাকতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন সরবরাহ ব্যবস্থার বিকাশেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।

সেমিনারে মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্সের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান মো. ফজলুল হক। জবাবে চেম্বারের প্রেসিডেন্ট জানান, আগামী নভেম্বর নাগাদ একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। সফরটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও যৌথ ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বাজার পরিস্থিতি, অবকাঠামো, নীতিগত স্থিতিশীলতা, দক্ষ জনবল, জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিকস এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় সরেজমিনে মূল্যায়ন করে থাকেন। ফলে সম্ভাব্য সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাত সম্পর্কে স্পেনের উদ্যোক্তাদের বাস্তব ধারণা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত সেমিনারে স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মাসুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নুরিয়া লোপেজ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরামর্শক পাবলো আরাউজো, মলিন্সের এশিয়া ও আফ্রিকার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক এলবা এবং রিকভারের সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের গ্লোবাল ডিরেক্টর আনা রোডেস।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তাঁরা বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, নীতিগত স্বচ্ছতা, দ্রুত সেবা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেনের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ সেই বৃহত্তর সম্ভাবনারই একটি দিক তুলে ধরছে। বিশেষ করে প্রচলিত খাতের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ও লজিস্টিকসের মতো নতুন খাতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে ব্যবসায়িক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ, নীতিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব প্রয়োজন হবে।

মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও স্পেনের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সেই সম্ভাব্য অংশীদারত্বের একটি নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। নভেম্বরের সম্ভাব্য স্পেনীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফর হলে বিনিয়োগের সুযোগগুলো আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে নতুন বাণিজ্যিক উদ্যোগের পথও তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত