প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাভারের ৫০ শয্যার বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসার জায়গা হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা সংকটে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জনবল সংকট, চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়া, ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালদের তৎপরতায় সরকারি এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাভারের আশুলিয়ার জিরানী বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একসময় হাসপাতালে ১২ জন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। তবে সরেজমিনে গিয়ে তাদের মধ্যে একজন চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাওয়া গেছে। হাসপাতালের স্থায়ী স্টাফও রয়েছেন মাত্র একজন। সংযুক্তির মাধ্যমে আরও পাঁচজন কর্মরত থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো এখনো পূর্ণ হয়নি। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্যাথলজি, এক্স-রে ও ইসিজির মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে বাইরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আসা রোগীদের অনেকেরই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
রোগীদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ঘিরে কথিত দালালচক্রের তৎপরতা। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ফটক ও আশপাশের প্রায় ১০০ গজ এলাকার মধ্যে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন সকাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দালালচক্র হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মূল ফটকের আশপাশে অবস্থান নেয়।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা টিকিট কেটে বের হওয়ার পর তাদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসা না পাওয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে সরকারি হাসপাতালের সীমিত সেবার সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, কথিত দালালরা হাসপাতালের চিকিৎসকদের পেছনে অবস্থান করে রোগীদের এক্স-রে ফিল্ম ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেন। এরপর চিকিৎসা কিংবা ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে রোগীদের পরামর্শ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কমিশনের ভিত্তিতে রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে নিউ সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আয়েশা হাসপাতাল, নাসির উদ্দিন ক্লিনিক, জাহানারা ক্লিনিক ও গাজী ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতি হাসপাতালে থাকার পরও সেগুলো ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক রোগীকেই বাধ্য হয়ে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের ট্রেজারার নার্গিস আক্তারের স্বামীর নামে ‘আয়েশা ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি তার স্বামী ইয়ার হোসেন পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া হাসপাতালের প্রকল্প চলাকালে নিয়োগ পাওয়া ফ্রিল্যান্সার কর্মীদের বিরুদ্ধেও রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ট্রেজারার নার্গিস আক্তার প্রথমে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি দাবি করেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি তার নামে নয়, তার স্বামীর নামে করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক চলতি দায়িত্বে থাকা ডা. শিবলী রহমান জানিয়েছেন, হাসপাতালের বাজেট, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং প্রকল্পের আওতায় থাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত বাজেট ছাড় হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল পাওয়া গেলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
দালালদের তৎপরতার বিষয়ে ডা. শিবলী রহমান বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় হাসপাতাল চত্বরে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বাজেটে ১০ থেকে ১৫ জন আনসার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। তার আশা, পর্যাপ্ত কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা গেলে হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই হাসপাতালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকা এবং ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত থাকার মতো সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকলে হাসপাতালটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে একজন রোগী যখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরজা থেকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসা না পেয়ে বাইরের প্রতিষ্ঠানের দিকে যেতে বাধ্য হন, তখন তার জন্য বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক চাপের নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়ার সময়, মানসিক উদ্বেগ এবং পরিবারের ওপর বাড়তি চাপও যুক্ত হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনেক সময় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরে বা আশপাশে দালালদের সক্রিয়তার অভিযোগ থাকলে রোগীদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মচারী ও রোগীদের জন্য একটি নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নিশ্চিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা সংকট কাটাতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, বন্ধ থাকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালু, চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার এবং নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল চত্বরে বহিরাগতদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। রোগীদের যাতে কোনো ধরনের প্রলোভন, চাপ বা বিভ্রান্তির শিকার হতে না হয়, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সাভারের এই ৫০ শয্যার হাসপাতালটি একসময় যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য পূরণে এখন নতুন করে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি পড়ে থাকবে, অথচ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে রোগীদের বাইরে যেতে হবে—এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের জন্য তা বড় ধরনের হতাশার কারণ হতে পারে। দ্রুত জনবল, বাজেট, নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা ঘাটতি দূর করা গেলে হাসপাতালটি আবারও এলাকার মানুষের নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।