প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকালে উপজেলার বৈদ্যার বাজার এলাকার আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির সামনে নদীতে ভাসমান অবস্থায় মরদেহগুলো দেখতে পেয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ পুলিশ। দুর্ঘটনার পর থেকে স্বজনদের মধ্যে যে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তার অবসান হলেও পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে শোকের ভার।
উদ্ধার হওয়া তিনজন হলেন ১৭ বছর বয়সী সামিনা, ২৪ বছর বয়সী সজিব এবং পাঁচ বছর বয়সী সামিন। এর আগে দুর্ঘটনার দিনই রায়েশা বেগম নামের ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় এখনো হেলাল উদ্দিন নামের আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে উদ্ধারের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরিফিন তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মধ্যেই শনিবার সকালে বৈদ্যার বাজার এলাকার আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির সামনে ভাসমান অবস্থায় মরদেহগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ পুলিশের সদস্যরা সেগুলো উদ্ধার করেন।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে আত্মীয়ের বিয়েতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ট্রলারে করে যাত্রা করেছিলেন ১৪ জন। পথে মেঘনা নদীতে ট্রলারটি ডুবে যায়। আকস্মিক এই দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে নদী থেকে উঠে আসতে পারলেও কয়েকজন নিখোঁজ হন। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনেরা নদীর তীরে ছুটে আসেন এবং নিখোঁজদের সন্ধানে শুরু হয় অপেক্ষা।
দুর্ঘটনার দিন রায়েশা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে সামিনা, সজিব, সামিন ও হেলাল উদ্দিনের সন্ধানে নদীতে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে নদীতে উদ্ধার অভিযান চললেও নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়ায় স্বজনদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছিল। নদীর স্রোত ও দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতির কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুই দিন পর শনিবার সকালে নদীতে তিনটি মরদেহ ভেসে ওঠার খবর পাওয়া গেলে ঘটনাস্থলে ছুটে যান উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। পরে মরদেহগুলো উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে, অন্যদিকে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। আত্মীয়ের বিয়েতে অংশ নিতে যাওয়া একটি পরিবারের আনন্দঘন যাত্রা যে এভাবে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। কয়েক ঘণ্টার একটি যাত্রা পরিণত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা এবং শেষ পর্যন্ত স্বজন হারানোর বেদনায়।
মেঘনা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি। প্রতিদিন এই নদীপথে বিভিন্ন ধরনের নৌযানে মানুষ ও পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। নদীপথে চলাচলের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, স্রোত, নৌযানের সক্ষমতা, যাত্রীসংখ্যা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো একটি ক্ষেত্রে অসতর্কতা বা ত্রুটি দেখা দিলে নৌযাত্রা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সোনারগাঁয়ের এই দুর্ঘটনাও নদীপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
তবে ঠিক কী কারণে ১৪ জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করা ট্রলারটি মেঘনায় ডুবে গেল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দুর্ঘটনার কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রয়োজন। নৌযানের অবস্থা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, নদীর স্রোত, আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এবং ট্রলার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো এখনো নিখোঁজ হেলাল উদ্দিনের সন্ধানে তৎপর রয়েছে। নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলো সম্ভাব্য এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার পর স্বজনদের অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘ না হয়, সে জন্য দ্রুততম সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, নদীপথে নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষের জন্যও সতর্কতার একটি বার্তা বহন করছে। নৌযানে ওঠার আগে যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নৌযান পরিচালনাকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সোনারগাঁয়ের মেঘনায় ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তিনজন একই পরিবারের হওয়ায় ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হেলাল উদ্দিনের সন্ধান এবং ট্রলারডুবির প্রকৃত কারণ নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা। প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশায় শুরু হওয়া অপেক্ষা তিনটি পরিবারের জন্য শেষ হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতিতে। এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান প্রত্যাশা, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান দ্রুত পাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।