একনেকে উঠছে ১৫ প্রকল্প, গুরুত্ব স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয়

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
একনেকে উঠছে ১৫ প্রকল্প, গুরুত্ব স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয়

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী সভায় নতুন ও সংশোধিত মিলিয়ে ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, স্থানীয় সরকার, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সড়ক যোগাযোগ, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, আর্থিক খাত ও আইনশৃঙ্খলা অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি খাত এতে স্থান পেয়েছে। ফলে এসব প্রকল্প অনুমোদন পেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন সেবা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, নদীভাঙন মোকাবিলা এবং সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে এর প্রভাব পড়তে পারে।

উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একনেকের সভা গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবায়ন কাঠামো, অর্থায়নের ধরন, সম্ভাব্য ব্যয় ও মেয়াদসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়। এ কারণে একনেকের বৈঠকে ওঠা প্রকল্পগুলোর তালিকা দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারও অনেকটা তুলে ধরে।

প্রস্তাবিত ১৫ প্রকল্পের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের তিনটি উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর একটি হলো মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রকল্প। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের সেবা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক পর্যায় থেকে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি প্রকল্পে যক্ষ্মা, এইচআইভি-এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা, রোগী পর্যবেক্ষণ, সচেতনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ মানুষের জীবন ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের তৃতীয় প্রকল্পটি পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের চতুর্থ দফা মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগও তৈরি করে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এ ধরনের চিকিৎসা অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট মহলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

আর্থিক খাতেও রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব। ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২-এর মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল ও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক খাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে সহায়তার বিষয় যুক্ত রয়েছে। এর আগে একই প্রকল্পের আওতায় খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে তিন বিভাগে শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগও। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়লে অনেক মানুষ নিজেদের দক্ষতার ভিত্তিতে আয়মূলক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার চাপও কমতে পারে।

পানিসম্পদ খাতে মুন্সীগঞ্জে বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং ভোলায় নদীভাঙন প্রতিরোধের প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জন্য নদীভাঙন শুধু বসতভিটা হারানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে কৃষিজমি, ব্যবসা, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতাও জড়িয়ে থাকে। একটি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হলে অনেক সময় বছরের পর বছর সঞ্চিত সম্পদ ও সামাজিক ভিত্তি হারিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। এ বাস্তবতায় নদীভাঙন প্রতিরোধ ও নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সুফল স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও রয়েছে ডিজিটাল ভূমি জরিপের উদ্যোগ। ভূমির মালিকানা, সীমানা, খতিয়ান ও রেকর্ড নিয়ে জটিলতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ ও তথ্য সংরক্ষণ বাড়ানো গেলে ভূমি-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দ্রুততা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই ধরনের ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনার তথ্যও আগে প্রকাশিত হয়েছে।

রংপুর বিভাগের সড়ক উন্নয়ন এবং তিন জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পও প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু বড় শহরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয় না। গ্রামীণ সড়ক ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নত হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো সহজ হতে পারে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষের জন্য ভালো যোগাযোগব্যবস্থা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মধ্যে সময় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমাতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামোর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পও একনেকের আলোচনায় আসার কথা রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণের কারণে দেশের বিভিন্ন শহরে সড়ক, পানি নিষ্কাশন, যোগাযোগ ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। পরিকল্পিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নাগরিক দুর্ভোগও বাড়তে পারে। তাই এ ধরনের প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিমান যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় উদ্যোগ। যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহী বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়নের প্রকল্প সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই তিন বিমানবন্দরের গুরুত্ব রয়েছে। রানওয়ের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রকল্পও প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প সাধারণত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি অর্থের কার্যকর ব্যবহার, জবাবদিহি ও আইনানুগ কার্যক্রম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ খাতেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে। পেকুয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং পার্বত্য তিন জেলায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় ব্যবসার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত ১৫ প্রকল্পের মধ্যে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মৌলিক সেবা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে। তবে শুধু প্রকল্প অনুমোদনই শেষ কথা নয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়মতো শেষ করা, নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা, মান বজায় রাখা এবং প্রকল্পের সুফল বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

একনেকের সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো পরবর্তী ধাপে যাবে। তখন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা, অর্থায়ন, কাজের অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ে এর প্রভাবের দিকে নজর থাকবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকবে, উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হবে এবং প্রকল্পের সুফল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে পৌঁছাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com