সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই, ভাতিজা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ। কোথাও দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার সঙ্গে অনুমোদিত তালিকার নাম ও ক্রমের মিল পাওয়া গেছে, কোথাও আবার সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের কারণে সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার আংশিক তালিকা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, প্রার্থীদের যোগ্যতা, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। এত বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাদ পড়া ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের অনেকে বাদ পড়েছেন, অথচ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনেরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। কিছু এলাকায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা, গুদামের অবকাঠামো এবং আর্থিক সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে তিনজনের নামের একটি প্যানেল কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানোর কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক সুপারিশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা থেকে পাঠানো তালিকা যথাযথভাবে পুনরায় যাচাই না করেই কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও নিয়োগপ্রক্রিয়ার সব পর্যায়ে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি জেলার তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

রংপুরের পীরগাছায় নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন হলেও পীরগাছায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষরযুক্ত দলীয় প্যাডে প্রশাসনের কাছে দেওয়া তালিকার সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমের মিল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের আটটিতে দলীয় তালিকার প্রথম স্থানে থাকা ব্যক্তি এবং অন্য ইউনিয়নে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তি ডিলার হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। এই মিল কীভাবে তৈরি হলো এবং প্রার্থীদের বাছাইয়ে দলীয় তালিকার কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।

পীরগাছায় অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি অন্নদানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের মেয়ে জয়িতা আক্তার জিনির নামও রয়েছে। তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান জয়িতা সার বিতান নামে ডিলারশিপ পেয়েছে। ইটাকুমারী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার শ্বশুর আলিমুদ্দিন ময়েন মোল্লা। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছেন সমালোচকেরা।

কুড়িগ্রামেও ডিলার নিয়োগের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সাইফুর রহমান রানা তাঁর নির্বাচনী এলাকার ১৫টি ইউনিয়নের ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। সেখানে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে ওই আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর। নাগেশ্বরী পৌর কৃষক দলের সদস্য সচিব মো. আদম আলী অভিযোগ করেছেন, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সোলায়মান ইসলাম মাস্টারের স্ত্রী জুঁই আক্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোলায়মান ইসলামের নাম ও পদ-পদবি উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের দলীয় প্যাডে প্রকাশিত একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে সোলায়মান ও তাঁর স্ত্রীর দাবি, তাঁরা বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খান বাবু এ নিয়োগকে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন। সংগঠনটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আসপাক হোসেন মিন্টু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মালিবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সদস্য হাসানুজ্জামান মাসুম মিয়াও বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রকৃত ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, গাইবান্ধা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বাবু বলেছেন, সোলায়মানের স্ত্রীর নিয়োগের বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না এবং কার সুপারিশে তা হয়েছে, সে সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।

নীলফামারীর ডিমলায়ও রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারের সদস্যদের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গয়াবাড়ী ইউনিয়নে মাবরুক বিজনেস সেন্টারের মালিক মাবরুক আল ইসলাম জোয়াদ ডিলার হয়েছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল বলেও তথ্য এসেছে। তাঁর বাবা মনোয়ার হোসেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য। অন্যদিকে, ডিমলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানের ছেলে তানভির রাফসান ডিমলা সদর ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন। তিনি খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুদামের আয়তন, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার মতো শর্ত যথাযথভাবে যাচাই না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহীতে ৬৯ জন সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তালিকা বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্য। চারঘাট, বাঘা, তানোর, পুঠিয়া, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী ও দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। চারঘাট সদর ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী জিনিয়া পারভিন, সরদহ ইউনিয়নে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ইসরাত জাহান এবং ইউসুফপুর ইউনিয়নে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে, যদিও অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।

রাজশাহীর এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকার প্রথমে রাখা হতো। তাঁর দাবি, কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দেওয়া তালিকা অনুসারেই নিয়োগ হয়েছে, ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সুযোগ হারিয়েছেন। বাগমারায় ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ডিলার নিয়োগ আটকে দিয়েছেন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল বারী। তাঁর অভিযোগ, দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে তিনি কৃষি সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন।

অন্যদিকে, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেছেন, উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে পাঠানো তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল এবং মন্ত্রণালয় নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার দাবি, তিন সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ হয়েছে এবং তিনজনের নামের প্যানেলে সংকেতপূর্ণ টিক চিহ্ন থাকার কারণে অন্য প্রার্থীদের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এই বক্তব্যগুলো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সুপারিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নাটোরে নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও নিয়োগ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। লালপুরের কদিমচিলান ইউনিয়নেও একই দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এক আবেদনকারী। মেহেরপুরে ২২ জন ডিলার নিয়োগ নিয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। সেখানে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসানের অনুসারীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হক এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসানের নামও নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আ ক ম আনোয়ারুল হক কালু জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, কোনো কারণ ছাড়াই কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হয়েছে এবং নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেরই ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী, বোনজামাই আরক মিয়া এবং ভাগনের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণার তিনটি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবুও ডিলার নিয়োগে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন। ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, লাইসেন্স দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা চলছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, সরকার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু নির্বাচিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও সার বিতরণের সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাঁর মতে, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগগুলো আলাদাভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিমও ডিলার নিয়োগে কিছু অনিয়মের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, বিষয়টি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করা হবে। কৃষি সচিব সেলিম খানের বক্তব্য জানতে ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ফলন এবং খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত। একজন ডিলারের দায়িত্ব শুধু ব্যবসা পরিচালনা করা নয়, বরং নির্ধারিত নিয়মে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা। অভিজ্ঞ ও সক্ষম ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরা নিয়োগ পেয়ে থাকলে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহে পড়তে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক একাই অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর যোগ্যতা, নিয়োগের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ অবস্থায় সার ডিলার নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, প্রার্থীদের যোগ্যতার নথি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সুপারিশ এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে পর্যালোচনা করার দাবি জোরালো হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগ, স্বচ্ছ আপিলপ্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ সার বিতরণব্যবস্থার মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ নয়; কৃষকের কাছে ন্যায্য নিয়মে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছে দেওয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com