প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে সম্প্রতি একাধিক এমডির পদত্যাগে নেপথ্যে রয়েছে বোর্ডের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি। চলতি সরকারের আমলে কিছু ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মিত হস্তক্ষেপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধ উপেক্ষা এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এমডিদের উপর চাপ দেওয়া দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আলোচনায় ছিল। এসব পরিস্থিতিতে সরকারি পরিবর্তনের পরও একই ধরনের চিত্র বিদ্যমান থাকায় এমডিরা মানসম্মান ও নিরাপত্তার কারণে পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন।
গত সাত থেকে আট মাসে ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে চারজনই মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে পদত্যাগ করেছেন। তারা মূলত ব্যাংকের বোর্ডের অনৈতিক দাবি মেনে না নেওয়ায় দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। কিছু এমডি নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে পদত্যাগ করছেন, আবার অনেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন, fearing that প্রকাশিত সত্য তথ্য ভবিষ্যতে অন্য কোথাও চাকরির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাংকের কিছু পরিচালক দাবি করছেন, এমডিরা প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পদত্যাগ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১০–১৫ বছর ধরে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিচালনা পর্ষদ ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং এর প্রভাব এখনও বিদ্যমান। ফলে অনেক এমডি স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না এবং বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন।
পদত্যাগ করা এমডিদের মধ্যে রয়েছেন—ঢাকা ব্যাংকের শেখ মোহাম্মদ মারুফ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মোশারফ হোসেন, সাউথইস্ট ব্যাংকের নুরুদ্দিন মো. ছাদেক হোসেন, মেঘনা ব্যাংকের কাজী আহ্সান খলিল, ন্যাশনাল ব্যাংকের তৌহিদুল আলম খান এবং ব্র্যাক ব্যাংকের সেলিম আর এফ হোসেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ পদত্যাগ করেছেন গত ২৯ জুলাই থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে।
ঢাকা ব্যাংকের এমডি শেখ মোহাম্মদ মারুফ মাত্র ১০ মাস দায়িত্ব পালন করার পর ১৪ আগস্ট পদত্যাগ করেন। তিনি জানিয়েছেন, পুরোপুরি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন এবং বোর্ডের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এমডি মোশারফ হোসেন ৩০ জুলাই পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পেছনে ৪৮ কোটি টাকা সুদ মওকুফ সংক্রান্ত বিতর্ক এবং বোর্ডের অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রভাব ফেলেছে।
মেঘনা ব্যাংকের এমডি কাজী আহ্সান খলিল জানান, নতুন বোর্ড কোনো কারণ ছাড়াই তাকে ছুটিতে পাঠানোর উদ্যোগ নিল, যা তিনি মেনে নেননি এবং পদত্যাগ করেছেন। ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আর এফ হোসেনও বোর্ডের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পর্কিত চাপের কারণে পদত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বর্তমানে পদত্যাগের বিষয়গুলো তদন্তাধীন। সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, আগে এমডি ও মালিক একসঙ্গে অনিয়ম করতেন, এখন অনেক এমডি মালিকদের চাপ সহ্য না করে পদত্যাগ করছেন। এ দ্বন্দ্বই হয়তো দীর্ঘমেয়াদে সুশাসনের পথ তৈরি করবে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, বোর্ডের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অস্পষ্টতার কারণে এমডিরা নিরাপত্তা, মানমর্যাদা এবং কর্মপরিকল্পনা রক্ষার স্বার্থে পদত্যাগের পথ বেছে নিচ্ছেন। ব্যাংক খাতের এই চলমান সংকট আগামী দিনে খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।