২৬ আগস্ট ২০২৫| নিজস্ব সংবাদদাতা| একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেড় দশক ধরে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ব্যর্থতার চারপাশে ঘোরপাক খাচ্ছে। সমুদ্রসীমার বিজয়ের বেশ কিছু বছর পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে কোনো ব্যাবহারযোগ্য তেল–গ্যাস আবিষ্কার হয়নি। নানা বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধান শুরু করেছিল, তবে তিনটি নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে কাজ ছেড়ে গেছে এবং একমাত্র বাকি কোম্পানিও এখন চুক্তি অনুসরণ না করেই চলে যাচ্ছে। এর ফলে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে।
পেট্রোবাংলা জানায়, সর্বশেষ দরপত্র আহ্বানে প্রথমে সাতটি বিদেশি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেছিল; পরে সময় বাড়ানো হয়েছিল আরও তিন মাস প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য, কিন্তু কাজ সম্পন্ন করে দরপত্র জমা দেয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান। এখন আবার নতুনভাবে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। এই প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বন থেকে চুক্তিপত্র সম্পন্ন ও কাজ শুরু হতে সাধারণত দেড়–দুই বছর সময় লাগে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে এই প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতে পারে বা সরকারের নির্বাচনের পর পরিবর্তিত হতে পারে।
২০১২ সালে ভারত ও ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের পর বিপুল এলাকা খোলা হয়েছিল তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য। পেট্রোবাংলা সেই অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি—মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করে নিয়েছে বঙ্গোপসাগরকে।
২০০৮ সালের পিএসসি মোডে ২০১০ সালে আমেরিকার কনোকোফিলিপস দুইটি গভীর সমুদ্র ব্লকে জরিপ চালায়, কিন্তু গ্যাসের প্রয়োজনীয় মূল্য না পেলে ২০১৫ সালে কর্মচ্ছিন্ন করে চলে যায়। পরবর্তীতে পিএসসি–২০১২ অনুযায়ী অগভীর সমুদ্রে ২০১৪ সালে চুক্তি হয় ভারতের ওএনজিসি ভিদেশ ও এক যৌথ কোম্পানির সঙ্গে, তবে তারা কাজ গুটিয়ে যায়, কোরিয়ার পসকো দাইয়ুও নির্ধারিত সময়ের আগে চলে গেছে।
কয়েক বছর একমাত্র কাজ চালাচ্ছিল ওএনজিসি। তারা ২০১৯ সালে কাজ শুরু করে একটি কূপ খনন করেছিল, কিন্তু গ্যাস পায়নি, এবং দ্বিতীয় কূপ খননের পূর্বে তারা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অতিরিক্ত কূপ খননের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা চুক্তির মেয়াদ না বাড়িয়েই চলে যেতে চায়। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ এ বিষয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্ৰহণ করেছে এবং চুক্তিটি বাতিল হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, ওএনজিসির কর্মচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত জানার পর জ্বালানি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলেছে; দরপত্র আহ্বানের পূর্বে বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে পিএসসি সংশোধন করে নতুন খসড়া তৈরি করা হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকট মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানিতে মনোযোগ বেশি ছিল। গ্যাস অনুসন্ধানের দিকে মনোযোগ কমে গিয়েছিল। যদিও ২০২৩ সালে নতুন পিএসসি চূড়ান্ত করা হয় এবং নির্দিষ্ট জরিপ ও ভূকম্পনসহ আগে আগ্রহ প্রকাশ হয়েছিল—বিশেষ করে মার্কিন বহুজাতিক এক্সনমবিল কিছু ব্লকে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল—তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দরপত্র আহ্বানে অন্তত চাহিদার পারিপার্শ্বিকতা বজায় রেখেই কাজ শুরু না হলে বিলম্ব বা ব্যর্থতার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, অনুসন্ধান জরিপে গ্যাসের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কোনো ক্ষেত্র কূপ খনন ছাড়াই নিশ্চিত নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার একই অঞ্চলে গ্যাস পেয়েছে, তাই বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গে পরামর্শে নতুন পিএসসিতে সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে, মুনাফা ভাগাভাগির পরিবর্তে রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো রাখা হয়েছে। এসব সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে কোনো কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিচ্ছে না, এমন ধারণা রয়েছে।
ভূতাত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলছেন, অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ করে; যখন আগে এই অঞ্চলে আগ্রহ ছাড়া হয়, তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, আর এখন প্রয়োজন দ্রুত দরপত্র আহ্বন ও অনুসন্ধান শুরু করা, কারণ একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেই বিদেশি বিনিয়োগ আগ্রহ ফিরে আসতে পারে।