আইফোন কেনার জন্য শ্রমের পার্থক্য, যুক্তরাষ্ট্র ৫ দিন, বাংলাদেশ ১২৫ দিন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১১০ বার
আইফোন কেনার জন্য শ্রমের পার্থক্য: যুক্তরাষ্ট্র ৫ দিন, বাংলাদেশ ১২৫ দিন

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই মডেলের আইফোন কেনার জন্য মানুষের শ্রমের পরিমাণে বিশাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। উন্নত দেশগুলোতে মাত্র কয়েক দিনের আয় দিয়েই নতুন আইফোন কেনা সম্ভব, যেখানে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মাসের পর মাসের অর্থসংগ্রহ প্রয়োজন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বিভিন্ন দেশের গড় আয়ের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে, আইফোন ১৭ প্রো (২৫৬ জিবি) কেনার জন্য কত দিন কাজ করতে হয়। গবেষণায় লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পর্যন্ত তুলনামূলক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, লুক্সেমবার্গে একজন গড় আয়ের ব্যক্তি মাত্র চার দিন কাজ করলেই আইফোন কিনতে পারবেন। সেখানে মাসিক গড় আয় প্রায় ৬ হাজার ৯৬৬ ইউরো বা প্রায় ১০ লাখ ৪ হাজার টাকা এবং আইফোনের দাম প্রায় ১ হাজার ২৮৯ ইউরো বা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন আইফোন কিনতে গড় আয়ের একজনকে পাঁচ দিনের শ্রম দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে মাসিক গড় আয় প্রায় ৫ হাজার ১৭৪ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং আইফোনের দাম প্রায় ১ হাজার ৯৯ ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।

ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতেও আইফোন কেনা তুলনামূলকভাবে সহজ। সুইজারল্যান্ডে গড়ে তিন দিনের কাজ করলেই ফোনটি কেনা সম্ভব। বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াতে চার দিনের কাজ প্রয়োজন, এবং অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও কানাডায় পাঁচ দিনের শ্রম দিয়েই নতুন আইফোন ক্রয় করা যায়। এই তালিকাগুলো দেখিয়ে দেয়, উন্নত দেশের নাগরিকরা প্রযুক্তি ও গ্যাজেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন।

তবে এশিয়ার দেশগুলোতে আইফোন কেনার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম অনেক বেশি। ফিলিপাইনে গড় আয়ের একজন ব্যক্তিকে ৩৯ দিন কাজ করতে হয় একটি নতুন আইফোনের জন্য। সেখানে মাসিক গড় আয় প্রায় ৪৪ হাজার ৮০০ পেসো বা প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। ভারতে এই সময় আরও বৃদ্ধি পায়; মাসিক গড় আয় প্রায় ২৫ হাজার রুপি বা প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, এবং আইফোন কিনতে প্রায় ১১৯ দিন কাজ করতে হয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর, ইতালি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে গড়ে ৮ দিন, স্পেনে ৯ দিন, পোল্যান্ডে ১৭ দিন, পর্তুগালে ২৪ দিন, হাঙ্গেরিতে ২৭ দিন, চিলিতে ৩২ দিন, মালয়েশিয়াতে ৪৫ দিন, থাইল্যান্ডে ৬১ দিন, ব্রাজিলে ৭৭ দিন, তুরস্কে ৮৯ দিন এবং ভিয়েতনামে ৯৯ দিন কাজ করা প্রয়োজন। এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রযুক্তি কেনা তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জিং।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও কঠিন। একটি নতুন আইফোন ১৭ প্রো (২৫৬ জিবি) কিনতে একজন গড় আয়ের ব্যক্তিকে প্রায় ১২৫ দিন কাজ করতে হবে। দেশের মাসিক গড় আয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ২৫৯ টাকা এবং দৈনিক গড় আয় ১ হাজার ২৮৪ টাকা (২২ কর্মদিবস ধরে)। প্রি-অর্ডার পর্যায়ে আইফোনের সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশে নতুন আইফোন কেনা একটি দীর্ঘ আর্থিক বিনিয়োগের দাবি রাখে।

দেশের শহরভিত্তিক বাস্তবতা দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নতুন আইফোন কেনা এখনও চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে যারা মাসিক গড় আয়ের নিচের পর্যায়ে। গ্রামের মানুষদের ক্ষেত্রে এটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার বাইরে, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলে গড় আয়ের তুলনামূলক কম হওয়ার কারণে একই ফোন কেনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় আরও বেশি।

আইফোন কেনার এই হিসাব শুধু অর্থনৈতিক পার্থক্যই তুলে ধরে না, বরং দেশের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবিকা নির্ধারণেও তথ্য উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের জনসাধারণের দৃষ্টিতে, প্রযুক্তি প্রাপ্তি এখনও বিলাসী হিসেবে গণ্য হয়। যুবসমাজের মধ্যে বৈদেশিক প্রযুক্তি পণ্যের প্রতি আগ্রহ থাকলেও তাদের জন্য এটি অর্জনের পথ কঠিন। ফলে অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চয় ও পরিকল্পনা করতে হয়, যাতে তারা একটি নতুন আইফোন কিনতে সক্ষম হন।

গবেষণাটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), অ্যাপল, ইকোনমিক টাইমস, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় কোন দেশে নতুন আইফোন কেনা সহজ এবং কোথায় তা কতটা চ্যালেঞ্জিং।

এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ও অর্থনীতির মধ্যে সংযোগ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি দেশের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্রয়ক্ষমতার পার্থক্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিশেষত যুবসমাজ ও শিক্ষিত শ্রেণি যারা বৈদেশিক প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট, তাদের জন্য এটি একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনার বিষয়।

ফলে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রযুক্তি অর্জন শুধু আয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, পরিকল্পনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও নির্ভরশীল। তুলনামূলকভাবে, উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা খুব কম সময়ে নতুন প্রযুক্তি উপভোগ করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এটি প্রায় চার মাসের ধৈর্য ও অর্থ বিনিয়োগের দাবি রাখে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত