প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গরু চোরাচালান বহু পুরোনো সমস্যা। বছরের পর বছর ধরে এ অপকর্ম সীমান্ত জনপদকে অশান্ত করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে করেছে ব্যতিব্যস্ত এবং স্থানীয় জনগণের জন্যও সৃষ্টি করেছে নানা ধরনের ঝুঁকি। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ সীমান্তে সংঘটিত এক সহিংস ঘটনায় আবারও সেই সমস্যার তীব্র রূপ প্রকাশ পেয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি টহল দলের ওপর সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা হামলা চালায়, যেখানে একজন বিজিবি সদস্য গুরুতর আহত হন। তবে বিজিবি পাল্টা পদক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে গরুভর্তি একটি ট্রলার জব্দ করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তার জটিলতা এবং চোরাকারবারিদের দুঃসাহসী কার্যকলাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিজিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (২৮ বিজিবি) আওতাধীন বাংলাভিটা বিওপি থেকে সুবেদার মো. ইসরাইল খানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি বিশেষ টহল দল সীমান্ত এলাকায় টহল পরিচালনায় যায়। সীমান্ত পিলার ১১৯০/১৫-এস থেকে প্রায় ৪০০ গজ ভেতরে রূপনগর এলাকায় অবস্থানকালে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ভারতীয় গরুভর্তি একটি ট্রলার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে টহল দল সেটি আটকানোর চেষ্টা করে।
এসময় সংঘবদ্ধ হয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন চোরাকারবারি হঠাৎ টহল দলের ওপর আক্রমণ চালায়। তারা ইট-পাথর নিক্ষেপ করে, দেশীয় অস্ত্র বল্লম ও দা ব্যবহার করে এবং এমনকি গাদা বন্দুক দিয়ে গুলিও চালায়। আকস্মিক এই হামলায় বিজিবির নায়েক মো. আখিরুজ্জামান গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিজিবি জানায়, হঠাৎ সংঘবদ্ধ হামলার মুখেও টহল দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পালিয়ে যাওয়ার আগে চোরাকারবারিরা এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে গেলেও বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে মোট ৩৩টি ভারতীয় গরু এবং গরুবাহী একটি বড় ট্রলার জব্দ করা হয়। এছাড়া হামলাকারীদের ফেলে যাওয়া বল্লম, দা, কাঁচি, পাথর ও ঢালের মতো দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় জব্দকৃত গরু, ট্রলার ও বিভিন্ন আলামত স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির, পিএসসি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, এ ঘটনায় মধ্যনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় গরু পাচারের রুট হিসেবে কুখ্যাত। বিশেষ করে ঈদুল আজহা বা বিভিন্ন উৎসবের আগে চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে গরু আনা শুধু আইনের পরিপন্থী নয়, বরং এ ধরণের কার্যকলাপের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ বৈধ পথে গবাদি পশু আমদানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চোরাচালান থেকে সৃষ্ট কালোবাজারি ব্যবসা দেশের পশুপালন শিল্পকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজিবি সীমান্তে গরু চোরাচালান দমনে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ টহল, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে গরু চোরাচালান কমানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবুও সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র তাদের দুঃসাহসিক কার্যকলাপ অব্যাহত রেখেছে। কখনও কখনও তারা সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীদের সহযোগিতা নেয়, আবার কখনও ভারতীয় সহযোগীদের সাথে মিলে গরু পাচারের পথ তৈরি করে। বিজিবি কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি।
চোরাকারবারিদের আক্রমণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সদস্যরা একই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন, কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। এ ধরনের প্রতিটি ঘটনায় সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে এবং বোঝা যায়, চোরাকারবারি চক্র কতটা শক্তিশালী এবং সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে। এই অবস্থায় বিজিবি সদস্যরা প্রায়শই জীবনবাজি রেখে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় জনগণও সীমান্তে চোরাকারবারিদের কারণে প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা জানান, এসব চক্র রাতের আঁধারে সীমান্ত এলাকায় ভিড় জমায় এবং সুযোগ পেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। অনেক সময় সাধারণ গ্রামবাসীরাও তাদের সহিংসতার শিকার হন। ফলে সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে।
এবারের ঘটনায় নায়েক আখিরুজ্জামানের গুরুতর আহত হওয়া বিজিবি সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সহকর্মীরা তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, এ ধরনের আক্রমণ তাদের দায়িত্ব পালনের মনোবল দুর্বল করতে পারবে না। বিজিবির এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের সদস্যরা দেশের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেন। তারা জানেন, যে কোনো মুহূর্তে প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে। তবুও তারা পিছপা হন না। কারণ সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু বিজিবির দায়িত্ব নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষারও প্রতীক।”
এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত। কেবল টহল বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং সীমান্তপারের সমন্বয় দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সঙ্গে আরও কার্যকর যৌথ পদক্ষেপই এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হতে পারে।
সুনামগঞ্জ সীমান্তে সাম্প্রতিক এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, বরং এটি সীমান্ত নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার প্রতিচ্ছবি। গরু চোরাচালান দমনে বিজিবির যে কঠোর অবস্থান এবং বারবার প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে চোরাকারবারিদের সাহসী ও সংঘবদ্ধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া এখন সময়ের দাবি।
সীমান্তের নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বিজিবির টহল অব্যাহত থাকবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় সীমান্তে এই ধরণের আক্রমণ ভবিষ্যতেও বিজিবির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।