বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে তিস্তার পানি, বন্যার শঙ্কায় কাটল নির্ঘুম রাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৬ বার
বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে তিস্তার পানি, বন্যার শঙ্কায় কাটল নির্ঘুম রাত

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ফের দেখা দিয়েছে বন্যার আতঙ্ক। তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলজুড়ে শুরু হয়েছে অস্বস্তি ও ভয়ের পরিবেশ। রবিবার রাত থেকেই নদীর পানি হু হু করে বেড়ে গিয়ে গ্রামাঞ্চল ও নিম্নভূমি প্লাবিত হচ্ছে। ফলে হাজারো মানুষকে তড়িঘড়ি করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয়েছে, অনেকেই রাত কাটিয়েছেন বিদ্যালয় ও আশ্রয়কেন্দ্রে। রাতের আঁধারে পানি বাড়তে থাকায় তিস্তা পাড়ের মানুষের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ২৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপরে। কিন্তু মধ্যরাতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ৫০ মিটারে, যা বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আশঙ্কা ছিল রাতের মধ্যেই তা ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। দ্রুত পানি বাড়তে থাকায় নদী তীরবর্তী এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হয় এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একইসঙ্গে জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রংপুরের গংগাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা এবং নীলফামারী ও লালমনিরহাটের তীরবর্তী অঞ্চলের বহু গ্রাম ইতোমধ্যেই প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সন্ধ্যার পর থেকে নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির কারণে সেখানকার মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং যাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে তাদের বিদ্যালয় ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।

তিস্তা তীরবর্তী বাসিন্দাদের অনেকে জানান, রবিবার বিকেল থেকেই পানির স্তর বাড়তে শুরু করে। সন্ধ্যার পর তা দ্রুত বাড়তে থাকায় বহু রাস্তা পানির নিচে চলে যায়। কোথাও কোথাও কাঁচা ঘরবাড়ি ও বাঁধের চারপাশের এলাকা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে যেকোনো সময় নদীর পানি ভেঙে শহর ও জনবসতিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ৫ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে ৬ অক্টোবর সকাল ৯টার মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উজানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করা হয়েছিল, যা রাতেই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ পানির তোড়ে তাদের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। চুলায় আগুন জ্বলছে না, শিশুরা খাবারের কষ্টে আছে। তিনি বলেন, “আমরা খুব বিপদে আছি। সরকার ও প্রশাসনের সহায়তা এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।” এভাবেই হাজারো পরিবার হঠাৎ তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিয়া জানান, তিস্তা ব্যারাজের একেবারে পাশেই হওয়ায় তাদের ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শুকনো খাবার ও ত্রাণ সহায়তা এখন অতি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, কয়েকদিনের টানা ভারি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তীরবর্তী এলাকাগুলোর মানুষকে অগ্রিম জানানো হয়েছিল যেন তারা সতর্ক থাকে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শায়খুল আরিফিন জানিয়েছেন, বর্তমানে তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলে রোপা আমন ধান, চিনাবাদাম ও শাকসবজির চাষ হচ্ছে। যদি পানি তিন থেকে চার দিন স্থায়ী হয়, তবে কৃষকের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তবে এক-দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ সীমিত থাকবে। তিনি বলেন, কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে এলাকায় একটি বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছিল, যা মেরামত করা হয়েছে। তবে অনেকের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং শুকনো খাবার বিতরণের কাজ চলছে। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কালীগঞ্জ নামক স্থানে তিস্তার ডান তীরের প্রধান বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেটির মেরামতকাজ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারাজের সব ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করে মাইকিং করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সন্ধ্যার পর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা মধ্যরাতে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ সেন্টিমিটারের ওপরে।

অবশ্য সরকারিভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও জানা যায়নি। তবে বন্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বারবার তিস্তার পানি বৃদ্ধি ও হঠাৎ বন্যার কবলে পড়ে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হচ্ছে।

তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এর তীরবর্তী এলাকায় বিস্তৃত কৃষিজমি এবং অসংখ্য মানুষের বসবাস। বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, উজানের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে প্রতিবছরই একই রকম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কৃষি, বসতবাড়ি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।

গত কয়েক বছরে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা আলোচনা হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনা চুক্তি কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় তিস্তার দুই তীরের মানুষ প্রতি বছর একইভাবে বিপর্যস্ত হবে।

এ মুহূর্তে তিস্তা পাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও প্রশাসনের সহায়তায় তারা যেন দ্রুত খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা পান। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কারণ বন্যা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন বাস্তবতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত