স্বামী-শাশুড়ির অনুরোধে বাড়ি ফেরার পর গৃহবধূর মৃত্যু: নড়াইলে চাঞ্চল্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
ফরিদপুরে নিখোঁজ কিশোরের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার

প্রকাশ:৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় এক গৃহবধূর অকাল মৃত্যু এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার চর-শালনগর এলাকায় একটি অটোভ্যানের ওপর পড়ে থাকা ১৮ বছর বয়সী জান্নাতি ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তার স্বামী সাজ্জাদ মিয়া (৩০) এবং শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছেন।

জান্নাতির পরিবার অভিযোগ করেছেন, বিয়ের পর থেকে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি যৌতুকের দাবিতে তাকে নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার করেছে। সূত্রের খবর, জুন মাসে পারিবারিকভাবে সাজ্জাদের সঙ্গে বিয়ে হয় জান্নাতির। বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক কলহ শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত বড় রূপ নেয়। গত মাসের ৩০ তারিখে পারিবারিক সংঘাতের কারণে জান্নাতি বাবার বাড়িতে ফিরে যান। তিন দিন পর সাজ্জাদ নিজে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মেয়েকে ফেরত নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে বাবার উপস্থিতিতে জান্নাতি মারধরের শিকার হন, এবং পরে তার মা জামাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।

ঘটনার দিন সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সাজ্জাদ ও তার মা জান্নাতিকে বাবার বাড়ি থেকে তাদের বাড়িতে ফেরার জন্য অনুরোধ করেন। দেড় ঘণ্টা পর তাদের ফোনে জানানো হয় যে জান্নাতি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং তাকে লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে জান্নাতির বাবা-মা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং অন্যান্য বেসরকারি ক্লিনিকে মেয়ের খোঁজ নিতে যান। পরে স্থানীয় একজন ফোন করে জানান যে সাজ্জাদের বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর একটি অটোভ্যানে জান্নাতির মরদেহ পড়ে আছে।

লোহাগড়া থানার পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাজ্জাদ মিয়া ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা পলাতক রয়েছেন। মৃতার পরিবার বলেছে, বিয়ের পর থেকেই জান্নাতি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন এবং তাদের বিশ্বাস, মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, মরদেহ সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য নড়াইল জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা একদিকে নারীর নিরাপত্তা ও পারিবারিক সংবিধানিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, পারিবারিক কলহ এবং যৌতুকের কারণে নারীদের উপর যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন হয়, তা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন। নড়াইলের এই ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব একাধিক মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে কারণ অভিযুক্তরা পলাতক। এই ধরনের ঘটনায় নড়াইল থানা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নারী অধিকার সংস্থাগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনগত কার্যক্রমে তাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে, যাতে দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা যায়।

বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার আলোচনার বিষয় হয়ে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌতুক প্রতিরোধ আইন থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি এবং সামাজিক মানসিকতার কারণে অনেক নারী সহিংসতার শিকার হন। এ ধরনের ঘটনা জনগণকে সতর্ক করতে এবং পরিবার ও সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ।

নড়াইলের এই ঘটনার মাধ্যমে একবার আরও স্পষ্টভাবে দেখা গেল, পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র পুলিশি ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক সমর্থন এই ধরনের অনৈতিক ও অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অপরিহার্য।

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় জান্নাতির বাবা-মা বলছেন, তাদের আশা পুলিশ দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। স্থানীয় সমাজও পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। এই ঘটনা শুধু নড়াইলের নয়, সমগ্র দেশের নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সচেতনতার ডাক দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত