সুর, ছন্দ ও রঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎ উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
সুর, ছন্দ ও রঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎ উৎসব

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা / একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলটা ছিল অন্য দিনের চেয়ে আলাদা। বাতাসে শরতের মিষ্টি গন্ধ, ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণে সাদা শাড়ির শুভ্রতা, সুর-ছন্দ আর রঙের মেলবন্ধনে যেন এক নতুন প্রাণের সঞ্চার। ‘শরৎ উৎসব ১৪৩২’ নামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল এক উন্মুক্ত শিল্প-উৎসব, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা মিলে শরতের সৌন্দর্যকে উদযাপন করেছেন সৃজনশীলতার নান্দনিক ভাষায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, সংগীত বিভাগ, নৃত্যকলা বিভাগ, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবের সার্বিক সহযোগিতা করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শুরু থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে ভরে ওঠে গোটা প্রাঙ্গণ। শিল্পের বিভিন্ন শাখার শিক্ষার্থীরা নিজেদের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশে মেতে ওঠে, কেউ গানে, কেউ নাচে, কেউবা চিত্রাঙ্কনে।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এ ধরনের উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য প্রয়াস। আমাদের একঘেয়ে ও যান্ত্রিক জীবনে এ ধরনের আয়োজনে মানুষ তার নিজের ভেতরের সৌন্দর্য ও মানবিকতার চর্চার সুযোগ পায়।”

অধ্যাপক বিদিশা আরও বলেন, “শরৎ উৎসব বাংলাদেশের চিরায়ত গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের শিকড়—এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই আমরা নতুন করে চিনে নিই নিজেদের। চারুকলার এই উৎসব শুধু ক্যাম্পাসেই নয়, বিশ্বদরবারেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।”

উৎসবে বক্তব্য রাখেন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন কাজী তামান্না হক সিগমা, সংগীত বিভাগের চেয়ারপারসন ড. প্রিয়াংকা গোপ, নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন তামান্না রহমান, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুস সালাম, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ তৈরি ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজনীয়তার কথা।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুরের মূর্ছনা, নৃত্যের তালে তালে শরতের শুভ্রতা যেন মিশে গেল এক অপূর্ব আবেশে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় গান, নাচ ও পারফরম্যান্স আর্টে ফুটে ওঠে ঋতুর রঙ ও অনুভবের গল্প। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন প্রতিটি মুহূর্ত, কেউ মোবাইলে ধারণ করেন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, কেউবা একটুখানি শান্তির হাসি ছড়িয়ে দেন চারপাশে।

চারুকলার প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় পেইন্টিং প্রদর্শনী প্রতিযোগিতারও, যেখানে শিক্ষার্থীরা শরৎকে নিজেদের কল্পনা ও তুলির আঁচড়ে তুলে ধরেন ক্যানভাসে। বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হন অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের ফারিয়া নওশিন আহমেদ ও সাজ্জাদুল ইসলাম এবং গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের ফরহাদ আলী। উৎসবের শেষপর্বে তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়, আর দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।

দিনের আলো নিভে আসার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের রঙ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। সুরের ধ্বনি ভেসে আসে দূর থেকে, বাতাসে মিশে যায় তবলার তান, তানপুরার টান ও কণ্ঠস্বরের মৃদু কম্পন। একসময় মনে হয়, চারুকলার বকুলতলায় শুধু শরৎ নয়, উপস্থিত রয়েছে এক নতুন বাংলাদেশের প্রতীক—যেখানে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও মানবিকতা মিলে তৈরি হয় এক সত্যিকারের সংস্কৃতিমনস্ক সমাজের স্বপ্ন।

দর্শনার্থীদের অনেকেই বলেন, এই ধরনের উৎসব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, কারণ এমন আয়োজন মানুষকে নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিকতার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎ উৎসব তাই কেবল একটি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত প্রতীক—বাংলার চার ঋতুর মধ্যে শরতের সৌন্দর্য, শিল্পের স্পর্শ, আর মানুষের অন্তর্গত শান্তির সন্ধানের এক মিলনক্ষেত্র। সুর, ছন্দ আর রঙের সেই মিলনে মিশে ছিল একাত্মতার বার্তা—যেখানে শিল্পই হয়ে উঠেছে মানুষের হৃদয়ের ভাষা, আর শরৎ যেন ছুঁয়ে গেছে প্রতিটি প্রাণে এক অপূর্ব মমতায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত