প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রোববার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের ১২৯ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী উপস্থিত ছিলেন। তবে আলোচনার শেষে কোনো আসনেই একক প্রার্থী নির্ধারিত হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “এখনই ব্যক্তিগত প্রচারণা নয়, সময় হলো দলকে শক্তিশালী করার। সবাই নিজ নিজ এলাকায় সংগঠনকে গতিশীল করুন, কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখুন।” তিনি সতর্ক করে দেন—মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতা যেন কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ বিরোধে পরিণত না হয়। এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দলীয় সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন।
বৈঠকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নেতারা পৃথকভাবে অংশ নেন। এটি ছিল জেলা ওয়ারি বৈঠক, যেখানে স্থানীয় সাংগঠনিক অবস্থা, নির্বাচনী প্রস্তুতি ও তৃণমূলের অবস্থান নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রার্থীদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা এবং মাঠপর্যায়ে প্রতিযোগিতা বা বিভাজন রোধ করা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠকে বলেন, “চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী ত্যাগী, যোগ্য ও জনসমর্থিত নেতাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। মনোনয়ন ঘোষণার পর সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একজনকে যখন মনোনয়ন দেওয়া হবে, বাকিদের দায়িত্ব হবে তাঁকে বিজয়ী করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করা।”
বৈঠক শেষে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট-৩ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “আজকের বৈঠকে মহাসচিব মূলত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত কাউকেই বাদ দেওয়া হয়নি, আবার কাউকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আমরা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
বৈঠকের আগে হবিগঞ্জের প্রভাবশালী নেতা, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক মেয়র জি কে গউছ সাংবাদিকদের বলেন, “সুনামগঞ্জ দিয়ে এই বৈঠক শুরু হয়েছে, পর্যায়ক্রমে মৌলভীবাজার পর্যন্ত চলবে। ঢাকায় এখন সিলেটের এত নেতা জড়ো হয়েছেন যে, মনে হয় পুরো সিলেটই যেন প্রার্থী!” তাঁর কথার মাঝেই ফুটে ওঠে, সিলেট অঞ্চলে মনোনয়নের প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
দলীয় উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, এই বৈঠকের মাধ্যমে আসলে মাঠপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে একটি ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে কেন্দ্র। তারা নিশ্চিত করতে চায়, মনোনয়নপ্রত্যাশীরা যেন আগেভাগে নিজেদের প্রচারণা শুরু করে দলীয় বিভক্তি তৈরি না করেন। বিএনপি এখন এমন অবস্থানে যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংগঠনের সংহতি রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “আজকের বৈঠকে মনোনয়ন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সবাইকে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, সবাইকে সেটি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
এর আগে শনিবারই বিএনপির কেন্দ্র থেকে সিলেট বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঢাকায় তলব করা হয়। বৈঠকে প্রতিটি আসনের সাংগঠনিক শক্তি, জনপ্রিয়তা, ভোটার সংযোগ ও স্থানীয় কৌশল নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি এই প্রক্রিয়াকে ‘তথ্যনির্ভর মনোনয়ন যাচাই’ বলে উল্লেখ করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবারের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় বিএনপি একটি আধুনিক ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবহার করছে। এতে প্রতিটি প্রার্থীর রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং পারিবারিক বা রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘অযোগ্যতার’ দিকগুলোও যাচাই করা হচ্ছে—যেমন বিদ্রোহী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ, ফৌজদারি অপরাধের ইতিহাস, অন্য দলের প্রভাবভোগ, কিংবা নির্বাচনী এলাকায় বিতর্কিত ভাবমূর্তি।
এই ডেটাবেজে প্রতিটি প্রার্থীর জন্য পাঁচটি যোগ্যতা ও পাঁচটি অযোগ্যতার ঘর রাখা হয়েছে। তথ্য পূরণের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি র্যাংকিং তৈরি হয়, যা মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়। দলীয় নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে এই র্যাংকিংয়ের ভিত্তিতেই প্রার্থী বাছাই করা হবে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানান, প্রতিটি আসনে একজনকেই চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে বিকল্প হিসেবে আরও দুইজনের নাম সংরক্ষণ করা হবে, যাতে নির্বাচিত প্রার্থী কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে দ্রুত বিকল্প সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এছাড়া যারা এবার মনোনয়ন না পাবেন, তাঁদেরকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিলেট বিভাগের এই বৈঠক শুধু মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মন জয়ের কৌশল নয়, এটি দলের ভিতরে শৃঙ্খলা ও ঐক্য টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। নির্বাচনের আগে এই ধরনের সংলাপের মাধ্যমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কার্যত তৃণমূল নেতাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—মনোনয়ন নয়, এখনই ঐক্যই হচ্ছে বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি।