প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি এখনই দেশে ফেরার কোনো পরিকল্পনা করছেন না এবং ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহতদের ঘটনায় ক্ষমা চাইবেন না। যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর সঙ্গে আলাদা সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেছেন। ভারতে এক বছরেরও বেশি সময় নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ হলেও দলটি তার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং বাংলাদেশে ফিরে আসবেন কেবল বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে।
লন্ডনে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কোনো পরিবারের ওপর নির্ভর করবে না। এটা আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো এক ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।” তিনি জানান, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা শুধু অন্যায় নয়, বরং ‘সেলফ-ডিফিটিং’। তার ভাষায়, “কোটি কোটি মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য তাদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া যায় না।”
রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ১২ কোটি ছাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনীতিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। গত মে মাসে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে, এরপর ইউনূস সরকারের অধীনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ হয়। বর্তমানে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।
হাসিনা বলেন, “আমরা আমাদের সমর্থকদের অন্য কোনো দলকে ভোট দিতে বলছি না। আমরা আশা করছি, বিবেকের জয় হবে এবং আওয়ামী লীগ নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।” তিনি বলেননি, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গোপন কোনো আলোচনায় তারা যুক্ত আছেন কি না। ইউনূস সরকারের মুখপাত্ররাও এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে অন্তত ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যা স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সহিংসতা ছিল। শেখ হাসিনা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনো প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ বা অন্য কোনো অপরাধে অংশ নিইনি।” তিনি যোগ করেন, “আমি দেশে ফিরবো না, যতক্ষণ না সরকার বৈধ হয়, সংবিধান রক্ষা পায়, এবং আইন-শৃঙ্খলা সত্যিকারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।”
আলাদাভাবে ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের ঘটনায় ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। ইন্ডিপেন্ডেন্ট তাদের প্রতিবেদনে এই বক্তব্যকেই শিরোনাম করেছে। হাসিনা বলেন, “আমি আমাদের প্রতিটি সন্তান, ভাই, বোন ও বন্ধুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি, যাদের আমরা জাতি হিসেবে হারিয়েছি। আমি তাদের প্রতি সমবেদনা জানাই, কিন্তু আমি কোনো হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিইনি।” তিনি দাবি করেন, তার পদক্ষেপগুলো ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ‘সৎ প্রচেষ্টা’, যাতে প্রাণহানি কম হয়।
তিনি বলেন, “আমার সরকার প্রথম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করেছিল, যা পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে বন্ধ করে দেয়।” আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বাংলাদেশের বিক্ষোভ দমনে নিহতের সংখ্যা এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবুও শেখ হাসিনা বলেন, “১,৪০০ নিহতের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। আমি মনে করি, আমাদের পদক্ষেপগুলো ছিল প্রয়োজনীয় এবং দায়িত্বশীল।”
নিজের দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি ৫ আগস্ট দেশ ছেড়েছিলাম বাধ্য হয়ে। দেশে থাকলে শুধু আমার নয়, আমার চারপাশের মানুষের জীবনও বিপন্ন হতো।” দেশত্যাগ ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেবল মুক্ত, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে সুস্থ করবে।”
ড. ইউনূস সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তবে আওয়ামী লীগ এতে অংশ নিতে পারবে না। নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি চাই মানুষ আমাকে মনে রাখুক সেই নেতা হিসেবে, যিনি সামরিক শাসনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করেছিলেন।” তার ভাষায়, “এই অর্জনগুলো এখন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”