প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার জাগির মালঞ্চি গ্রামে জমি নিয়ে দীর্ঘ দিনের বিরোধের পর কৃষক আব্দুস ছাত্তার মৃধা’র গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ সোমবার আদালত যথাযোগ্য বিচার-বিভাগীয় পদ্ধতিতে রায় ঘোষণা করেছে। মৃত আব্দুস ছাত্তার মৃধার স্ত্রী রাশিদা পারভীন অভিযোগ করে ছিলেন, ২০১৮ সালের ১৬ জুন সকালে জমি সংক্রান্ত বিরোধের উত্তেজনায় সেদিন সকালে তার স্বামিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
আদালত রায়ে মোট দশ জন আসামিকে জীবনভর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি একই মামলায় তিন জন অভিযোগমুক্ত বা খালাস পেয়েছেন—তাদের মধ্যে রয়েছেন শেফালী খাতুন, ছনেতা খাতুন ও হালিমা খাতুন। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অশোক কুমার সাহা। মামলার প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে ছিলেন মো. আব্দুর রাজ্জাক।
আরও জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের দিন ওই গ্রামে জমিজমা নিয়ে মনমুটাভর্তি বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। বিরোধের সূত্রপাত ঘটে আব্দুস ছাত্তার মৃধা ও একাধিক প্রতিবেশীর মধ্যে। রাশিদা পারভীন ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ “অজ্ঞাত আরও কয়েকজন”কে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার দীর্ঘ শুনানিকালে আদালতে স্পষ্ট গঠনমূলক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যবেক্ষণ করে অভিযুক্ত দশ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সর্বোচ্চ সাজা—জীবনভর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—নিষ্পত্তি করেছেন।
এই রায়ের মুহূর্তে দুটি বিষয় বিশেষভাবে মানুষের মনযোগ কাড়ছে। প্রথমত, গ্রামীণ এলাকায় জমিজমার জন্য সৃষ্ট এই হত্যাকাণ্ডটি আবারও তুলে ধরেছে কীভাবে এক সাধারণ জমি বিরোধ প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। আর দ্বিতীয়ত, মামলা চলাকালীন ‘‘পলাতক’’ হিসেবে আবর্তিত থাকা দুই আসামির নাম আজ আদালতে উচ্চারণ করা হয় না—রায়ে উল্লেখ করা হয় তারা আজও দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে উপস্থিত নেই।
রায়ের মুহূর্তে পিপি মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “স্বাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা, আর তিন জনকে খালাস দিয়েছে।” উল্লেখ্য, দুই আসামি এখনও পলাতক অবস্থায় রয়েছে। এই তথ্য আদালতের প্রকাশিত রায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, মালঞ্চি গ্রামের শান্তিময় চিত্র এখন ভেঙে পড়েছে ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। একাধিক মানুষ এখনো জমিতে যাওয়ার সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। নিহত আব্দুস ছাত্তার মৃধার স্ত্রী রাশিদা পারভীন বলছিলেন, “আমার স্বামীকে হঠাৎ প্রাণহানি হলো, আজও সেই ক্ষত মিটে যায়নি। কিন্তু আজ আদালতের রায়ে আমরা একটু হলেও ন্যায়ের অনুভব করছি।”
এই রায় শুধু দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রতি একটি বার্তা নয় — গ্রামীণ অঞ্চলে জমি বিরোধ কতটা দ্রুত মারাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে, তা একবারে সামনে এনে ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এধরনের রায় ঘৃণা, খুন বা হত্যাপ্রবণতা থেকে অন্যদের বিরত রাখতেও সহায়ক হতে পারে।
তবে, হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন কারো চোখে পড়ছে — দণ্ডপ্রাপ্ত দশ আসামি মধ্যে কারা ঠিক কারা, তাদের পূর্ববর্তী বিচারবহির্ভূত কার্যকলাপ কেমন ছিল, এবং, পলাতক অবস্থায় থাকা দুই আসামির ভবিষ্যৎ কী হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে এই দিকেও চোখ রাখতে হবে।
আদালতের এ রায় মলমে যেমন শান্তির বীজ বপন করতে পারে, তেমনই গভীরে যেসব ঘাটা আছে — যেমন জমির খোঁচা-ঝগড়া, ক্ষমতার দাপট, নিরাপত্তাহীনতা — সেগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। মালঞ্চি গ্রামবাসী, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এই ধরণের ঘটনায় পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সক্রিয় হতে হবে।
বর্তমানে মালঞ্চি গ্রামের চেয়ে পাংশা উপজেলার অন্য অঞ্চলেও সময় সময় জমি সংক্রান্ত বিরোধের খবর পাওয়া যায়। গ্রামীণ জনজীবন ও সামাজিক বন্ধন রক্ষায় এসব বিষয়ে দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান আয়োজন করাই বাস্তব চ্যালেঞ্জ। আজকের রায় সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা যেতে পারে।
এই রায়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শান্তি কক্ষ তৈরি করার জন্য একান্ত প্রয়োজন — যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলা হবে, বরকরের সুরক্ষা দেওয়া হবে, এবং যাতে অপরাধের পুনরাবৃত্তি না হয়। মালঞ্চি গ্রামের মানুষ আশা করছে, আজকের রায় যেন তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ খুলে দেয়। শহরের আলোঝলমলে নয়, এই গ্রামীণ জনপদেই ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সামাজিক পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি আজ একটু হলেও নিশ্চিত হয়েছে।