দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৩ ঘণ্টা ব্যাপী বিশ্বের দীর্ঘতম পরীক্ষা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ রোববার দুপুরে

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাজগতে আজ বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) অনন্য এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ শিহরিত। সকাল ৮টায় শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম এবং জটিল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, সুনুং বা সিসেট (College Scholastic Ability Test)। এই পরীক্ষা মোট ১৩ ঘণ্টা স্থায়ী হবে এবং সারা দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা এর প্রস্তুতি ও অনুশীলনে ব্যাপকভাবে নিযুক্ত। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সারাদেশে নীরবতা এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বছর এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিটি জেলা ও শহরে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের বিঘ্নবোধ না করে পরীক্ষা দিতে পারেন, সেজন্য সারাদেশে বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও, পরীক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ নজরদারি করছে।

সিসেট পরীক্ষা শুধু সময়ের দীর্ঘতা বা কঠিনতার জন্যই আলাদা নয়; এটি দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই, এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবন নির্ধারিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল জ্ঞান পরীক্ষা নয়, বরং মানসিক সহনশীলতা, ধৈর্য এবং মনোযোগের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে।

পরীক্ষার সূচনা হয় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। প্রথম ধাপের অংশে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে প্রশ্নপত্র সমাধান করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধাপ স্থায়ী হয় টানা সাড়ে ৮ ঘণ্টা, যা বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে শেষ হয়। তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সময় বাড়িয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়, ফলে পরীক্ষার মোট সময় দাঁড়ায় ১৩ ঘণ্টায়।

শিক্ষাবিদ এবং বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দীর্ঘ পরীক্ষা কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পরীক্ষা করে না, বরং তাদের মানসিক সহনশীলতা, চাপ মোকাবেলার ক্ষমতা এবং একনিষ্ঠভাবে কাজ করার দক্ষতা যাচাই করে। পরীক্ষার সময় প্রতিটি কেন্দ্রে শিক্ষকদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা উপস্থিত থাকেন, যারা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের ডিস্ট্রাকশন বা আওয়াজে বিঘ্নিত না হন, সে জন্য স্থানীয় নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত উচ্চমানের এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কঠোর। সিসেট পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের কঠোর প্রস্তুতি, ঘন্টাধারী অধ্যয়ন এবং পরীক্ষার চাপ সহ্য করার ক্ষমতা যাচাই করে। প্রতি বছর এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা একাধিক মাস ধরে প্রস্তুতি নেন, যা কখনো কখনো পরিবারের আর্থিক ও মানসিক চাপও বৃদ্ধি করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষাগত দক্ষতা নয়, জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনোবল, ধৈর্য এবং সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও অর্জন করে।

পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালায়। পরীক্ষার স্থানে প্রবেশের আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কড়া পরিচয় যাচাই এবং নিরাপত্তা চেকের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হয়। এছাড়াও, পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা সুবিধা রাখা হয়েছে।

এই পরীক্ষার কারণে দেশব্যাপী একটি বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষ সর্বত্র শান্তি বজায় রাখে, দোকানপাট বন্ধ থাকে, রাস্তায় কম যানবাহন চলে এবং শহরগুলো নীরবতার সঙ্গে পরীক্ষা চলাকালীনভাবে এক ধরনের ঐক্যবদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করে। অভিভাবকরা বাড়িতে শিক্ষার্থীদের জন্য স্ন্যাকস ও পানি রাখেন এবং মোবাইল বা অন্যান্য ডিস্ট্রাকশন থেকে তাদের দূরে রাখেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিসেট পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই পরীক্ষা শুধু একটি শিক্ষামূলক কার্যক্রম নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রতিযোগিতা, ধৈর্য এবং মানসিক দৃঢ়তা শিখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার এই পরীক্ষা আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার দৃষ্টিকোণে একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং মানসিক চাপ যাচাই করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করলেও, সিসেট পরীক্ষার দীর্ঘতা, জটিলতা এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত সহায়তা এটিকে অনন্য করে তোলে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, চাপের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা এবং জ্ঞান পরীক্ষা করার এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জীবনে বড় ভূমিকা রাখে। এটি তাদের ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এবং পেশাগত জীবনের জন্য মানসিক প্রস্তুতি, ধৈর্য ও সহনশীলতা তৈরি করে।

এভাবে, আজ দক্ষিণ কোরিয়ার চারপাশে পুরো দেশ শিক্ষার্থীদের জন্য এক জায়গায় সমবেত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ১৩ ঘণ্টার কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষা কেবল তাদের জ্ঞান নয়, বরং তাদের মানসিক শক্তি, মনোযোগ এবং ধৈর্য পরীক্ষা করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অবদান রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত