প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—জকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্যানেল ঘোষণা করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পর যখন জকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনার জন্ম হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে শিবিরের পক্ষ থেকে ঘোষিত প্যানেলটি নতুন করে এক ধরনের রাজনৈতিক গতিশীলতা যুক্ত করেছে।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শহীদ রফিক ভবনের নিচতলায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ নামের এই প্যানেলের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
ঘোষিত প্যানেলে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন শিবিরের শাখা সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম, যিনি আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। জিএস পদে রয়েছেন শাখা সেক্রেটারি আব্দুল আলিম আরিফ, একই শিক্ষাবর্ষের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ছাত্র। এজিএস পদে আছেন আপ বাংলাদেশের জবি সংগঠক এবং পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা।
প্যানেল ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও সরব হয়ে ওঠে। বহু বছর পর জকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—এটাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় প্রত্যাশা। কিন্তু সেই নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অংশগ্রহণ বিষয়টিকে নতুন আলোচ্য করে তুলেছে। কারণ, মূলধারার ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা এই সংগঠনের এমন আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে প্যানেলের অন্যান্য পদেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়। প্যানেলে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন মো. নূরনবী; শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকে সুখীমন; স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদকে নূর মোহাম্মদ; আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক হাবিব মোহাম্মদ ফারুক; আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নওশীন নওয়ার জয়া; সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক নাহিদ হাসান রাসেল; ক্রীড়া সম্পাদক জার্জিস আনোয়ার নাইম; পরিবহন সম্পাদক তাওহিদুল ইসলাম; সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান এবং পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. সোহাগ আহম্মেদ।
নির্বাহী সদস্য পদে রয়েছেন শান্তা আক্তার, সালেম হোসেন সিয়াম, ফাতেমা আক্তার অওরীন, আকিব হাসান, হাফেজ কাজী আরিফ, মো. মেহেদী হাসান ও আব্দুল্লাহ আল ফারুক। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, প্যানেলটি গঠনে অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, ক্যাম্পাসে সক্রিয় ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্যানেল ঘোষণার পর রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জকসু নির্বাচন শুধুমাত্র একটি ছাত্রসংসদ গঠনের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিতের একটি বড় সুযোগ। তিনি দাবি করেন, তাদের প্যানেল নির্বাচিত হলে প্রশাসন, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে একটি আধুনিক, নিরাপদ এবং শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্যানেল ঘোষণাকে ঘিরে নানামুখী আলোচনার জন্ম হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ছাত্রশিবিরের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। আবার অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষত যে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা বা দলীয় সংঘাতের আশঙ্কা করেন, তারা চাইছেন নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হয়।
এদিকে জকসু নির্বাচনে আগ্রহ বেড়ে গেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। গত তিন দিনে প্রায় ৩১২ জন শিক্ষার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, এটি বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে সাড়া জাগানো ছাত্রসংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর তৎপরতা মিলিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এখন নির্বাচনী আবহে ভাসছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি কয়েক ধাপে এগোচ্ছে। ৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শুরু হয় যা ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলে। আজ ১৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। আগামী ১৯ ও ২০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর ২৩ নভেম্বর প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২৪, ২৫ এবং ২৬ নভেম্বর আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত তালিকা চিহ্নিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যবেক্ষণ টিম এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জকসু নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরজুড়ে এখন এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক উত্তেজনা কাজ করছে। পোস্টার, প্রচারণা, শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে আসা নানা ইস্যু—সব মিলিয়ে নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটিই শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন প্রাণসঞ্চার করছে। কিন্তু ছাত্রশিবিরের প্যানেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
অবশেষে বলা যায়, ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের ঘোষণা জকসু নির্বাচনে প্রতিযোগিতার মাত্রা বাড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হবে কোন প্যানেল কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছে এবং শিক্ষার্থীরা কাদের ওপর আস্থা রাখছেন। সময়ই বলে দেবে, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে কোন শক্তি জয়ী হয়ে জকসুর নতুন পথচলা শুরু করবে।