হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে আলটিমেটাম, স্থগিত অবরোধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে আলটিমেটাম, স্থগিত অবরোধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর ওপর নৃশংস হামলা ও দুইজনকে তুলে নিয়ে নির্মম মারধরের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছে পুরো ক্যাম্পাস। নিরাপত্তাহীনতা, হামলাকারীদের অবাধ চলাফেরা এবং ঘটনার পরপরই প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে কাজলা গেট এলাকায় বিক্ষোভে নামে। দীর্ঘ উত্তেজনার পর তারা তিন দফা দাবি উত্থাপন করে নয় ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে। সেই সময়ের মধ্যে কোনো অগ্রগতি না দেখা গেলে রাত ১১টার পর তারা ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়ক এবং রেলপথ পুরোপুরি অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাতের একটি রক্তাক্ত হামলা। রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটের সামনে অবস্থিত একটি হোটেলে ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী আল ফারাবী ও তাহমিদ আহমেদ বখশী এবং নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মিনহাজ রাতের খাবার খেতে যান। সাধারণ দিনের মতোই আড্ডা আর খাবারের মাঝে সময় কাটছিল তাদের। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ১০ থেকে ১৫টি মোটরসাইকেলে চড়ে মুখোশধারী ও হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা হোটেলে ঢুকে তাদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। মিনহাজকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ফেলে রাখা হয় মাটিতে, আর আহত অবস্থায় আল ফারাবী ও তাহমিদকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায় তারা।

রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ঘটনার ছবি ও ভিডিও। শিক্ষার্থীরা দলে দলে কাজলা গেটের দিকে ছুটে আসেন। কেউ জরুরি ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, আবার কেউ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান আহতদের খোঁজ নিতে। রাত ১২টার মধ্যেই বর্বরতার কিছু চিহ্ন সামনে আসে। দুর্বৃত্তরা আহত আল ফারাবীকে বিনোদপুর বেতার মাঠ এলাকায় ফেলে রেখে যায়। একইভাবে অতিরিক্ত মারধরের চিহ্ন নিয়ে তাহমিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হলের সামনে ফেলে রাখা হয়। তাদের সারা শরীরে আঘাতের দাগ, হাত-পায়ের ক্ষত এবং মাথায় গভীর জখম দেখে চিকিৎসকরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন। বর্তমানে তারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তবে সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে হামলার উদ্দেশ্য। কারা, কেন, কোন শক্তির আশ্রয়ে ঘটিয়েছে এত বড় হামলা—এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা। রাতেই তারা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু ঘটনাস্থলে কেউ তেমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। দুপুর ১২টার দিকে ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাজলা গেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রথমে এটি বিভাগভিত্তিক মনে হলেও দ্রুতই এটি বৃহত্তর ছাত্রসমাবেশে রূপ নেয়। বিভিন্ন অনুষদ, হল এবং বিভাগের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হতে থাকেন। সড়কের দুই পাশে যানবাহন জমে যান, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষও। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি—নিরাপত্তা না থাকলে ক্লাস-পরীক্ষা সবই অর্থহীন।

দুপুর ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করেন। তবে শর্ত খুবই কঠোর—তারা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন এবং নয় ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। এই সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় রাত ১১টার পর থেকে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ শুরু হবে। এমন ঘোষণার পর রাজশাহী শহরজুড়ে উদ্বেগ বাড়ে, কারণ এই দুটি পথ একযোগে অবরোধ হলে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে, মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, ঘটনা তদন্ত শুরু হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, তদন্ত আগের মতো ধীরগতির হলে হামলাকারীরা পালিয়ে যাবে কিংবা প্রভাবশালী কারও ছায়ায় আড়াল হয়ে যাবে। ফলে তাদের দাবি—তদন্তে স্বচ্ছতা, দ্রুততা এবং হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার মাধ্যমে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তাহীনতার নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। রাতের অভ্যন্তরীণ রাস্তায় অপরিচিত মুখ, মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যুবকদের দেখে বহু শিক্ষার্থী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বারবার। বুধবারের ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও প্রবল করেছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা বলা হলেও এর বাস্তব চিত্র খুবই হতাশাজনক। পুলিশি টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা, বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তাকর্মী—সবকিছুই যেন কাগুজে পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ। তারা মনে করেন, এ ধরনের নৃশংস হামলা ঘটতে না দিলে আজ তাদের রাস্তায় নামতে হতো না।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক বলেছেন, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ স্বাভাবিক। তারা মনে করেন, নিরাপদ ক্যাম্পাস ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। তবে আন্দোলন দীর্ঘ হলে তা শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। ফলে দ্রুত সমাধানে তারা প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে হামলার বহু ঘটনা থাকলেও এবার শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ায় দৃঢ়তা বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—যতক্ষণ না হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে, ততক্ষণ সড়ক ও রেল অবরোধসহ আরও কঠোর আন্দোলন হবে। রাত ১১টার আলটিমেটাম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শহরজুড়ে টানটান উত্তেজনা, প্রশাসনও চাপের মুখে।

এখন প্রশ্ন একটাই—আট ঘণ্টার এই সময়ের মধ্যে কি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শুরু হবে এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে, নাকি বৃহত্তর উত্তপ্ত আন্দোলনের দিকে এগোবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়? শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক—সবাই সেই উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com