প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও তা পূরণ না হওয়ায় এবার আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সহকারী শিক্ষক পদটি নবম গ্রেডে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করে দ্রুত সময়ে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের’ গেজেট প্রকাশসহ মোট চারটি দাবির প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তারা। দীর্ঘদিনের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সত্ত্বেও কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় শিক্ষক সমাজ এবার প্রতিবাদের সুর আরও তীব্র করেছে। তাদের ঘোষণা—৩০ নভেম্বরের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ১ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে পূর্ণ কর্মবিরতিতে যাবেন শিক্ষকরা। এতে দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় মাউশির সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হবে। ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এন্ট্রিপদ নবম গ্রেডভিত্তিক (ক্যাডার) পদসোপানের আলোকে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামের সংগঠনের ব্যানারে এই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কর্মরত হাজারো শিক্ষক অংশ নেবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। শিক্ষকরা মনে করেন, তাদের দাবি বাস্তবায়ন হলে কেবল শিক্ষকদের পেশাগত মানই উন্নত হবে না, বরং মাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মানও আরও শক্তিশালী হবে।
দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সহকারী শিক্ষক পদটি নবম গ্রেডে ক্যাডারভুক্ত করার বিষয়টি। বহু বছর ধরে শিক্ষকরা দাবি জানিয়ে আসছেন, প্রশাসনের অন্যান্য শাখার মতো মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও একটি শক্তিশালী ক্যাডার কাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি ক্যাডারভুক্ত নয়, যার ফলে নিয়োগ, পদোন্নতি, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদার ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা পিছিয়ে থাকছেন। শিক্ষক নেতাদের দাবি, একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের সমমানের মর্যাদা পাওয়া সময়ের দাবি। নবম গ্রেডভিত্তিক ক্যাডার কাঠামো চালু হলে শিক্ষকদের পেশার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়বে এবং সারা দেশে মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নত হবে।
অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে আছে বলে অভিযোগ। ফলে তারা একই পদে বছরের পর বছর ধরে দায়িত্ব পালন করলেও যোগ্যতার ভিত্তিতে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। শিক্ষকরা মনে করেন, এ ধরনের অব্যবস্থাপনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভই বাড়ায় না, বরং কর্মপ্রেরণাও কমিয়ে দেয়। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সুসংগঠিত প্রশাসন পরিচালনার জন্য পদোন্নতি ও পদায়নের ন্যায্যতা অত্যন্ত জরুরি।
দাবির মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ দ্রুত প্রদানও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু শিক্ষক রয়েছেন যারা নানা আইনি জটিলতার কারণে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আদালতের রায় শিক্ষকদের পক্ষে গেলেও তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষক সমাজে গভীর ক্ষোভ জমে আছে। আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, এই বঞ্চনার অবসান না হলে শিক্ষকদের আর্থিক চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি মানসিকভাবেও তারা হতাশ হয়ে পড়বেন।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষকদের তিন-দুইটি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধা পুনর্বহালের দাবি জানানো হচ্ছে। এই সুবিধা ২০১৫ সালের আগে পর্যন্ত বহাল থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষকরা বলছেন, এই সুবিধা না থাকায় নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা আর্থিকভাবে কঠোর সংকটে পড়েন। দেশে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সুবিধা পুনর্বহাল করা সময়ের দাবি।
বৃহস্পতিবারের অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কর্মবিরতি শুরু হলে বছরের শেষদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হতে পারে। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণে সরকার দ্রুত উদ্যোগ না নিলে শিক্ষার পুরো কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি জানিয়ে আসছেন। কখনো মানববন্ধন, কখনো স্মারকলিপি প্রদান, আবার কখনো প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তর থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না আসায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তারা জানান, তাদের উদ্দেশ্য সরকারকে চাপে ফেলা নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে একটি শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত কাঠামো গড়ে তোলা।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের আন্দোলন দীর্ঘদিনের সমস্যার প্রতিফলন। দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পেশাগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সব সময় তারা পিছিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার এবং উচ্চশিক্ষা ক্যাডারের মতো মাধ্যমিক স্তরেও একই কাঠামো প্রবর্তন করা হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমন্বয় আসবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক শিক্ষা বিশ্লেষক মনে করেন, শিক্ষকদের দাবি যথার্থ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নত হবে। কেননা একটি দেশের উন্নয়নে দক্ষ শিক্ষক সমাজই সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি।
এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানতে চাইলেও সরকারি পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের কিছু সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষকদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং শিগগিরই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যদিও আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, শুধু আশ্বাসে সমস্যার সমাধান হবে না; বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই তাদের আন্দোলন প্রত্যাহারের একমাত্র উপায়।
শিক্ষকরা জানান, তারা শিক্ষা ব্যবস্থা অচল করতে চান না, বরং সঠিক কাঠামো নিশ্চিত করে শিক্ষকতা পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করতে চান। তাই সরকারের কাছে তারা আহ্বান জানিয়েছেন—দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনা করে শিক্ষকদের সঙ্গে সংলাপে বসার। অন্যথায় ১ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে পূর্ণ কর্মবিরতির মতো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি অনিবার্য হয়ে উঠবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে আন্দোলনরত শিক্ষক সমাজের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার। আন্দোলনের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে শিক্ষকদের দাবি পূরণে দ্রুত সিদ্ধান্তই পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে।