ভারত কেন শেখ হাসিনাকে ধরে রাখতে চায়, প্রশ্ন উঠছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮১ বার
ভারত কেন শেখ হাসিনাকে ধরে রাখতে চায়, প্রশ্ন উঠছে

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এক নতুন বাস্তবতা জন্ম নিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকনির্দেশককেও নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এই পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখনও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের একটি প্রধান ‘অপরিহার্য’ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করছেন। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এক জটিল কৌশলগত হিসাব-নিকাশ।

প্রথমত, ভারতের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা ছিলেন একটি নির্ভরযোগ্য এবং পরীক্ষিত রাজনৈতিক সম্পদ। বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কারণে তিনি দিল্লির কাছে একজন ‘সহযোগী শাসক’ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, নদী ও বন্দর ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট সুবিধা, এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে একতরফা ছাড় এবং সমঝোতা—এসবের মাধ্যমে তিনি ভারতের দৃষ্টিতে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের গোয়েন্দা ও কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে তার শাসনকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তাই ভারতের জন্য তার পতন কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি কৌশলগত শূন্যতা তৈরি করেছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার বিকল্প সীমিত। তার পরিবার ও রাজনৈতিক ইতিহাস ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত আনুগত্যে এমন একটি প্রভাব তৈরি করেছে, যা অন্য কোনো বাংলাদেশের নেতা এখনো অর্জন করতে পারেনি। এই কারণেই ভারতের নীতিনির্ধারকরা তাকে ‘নির্ভরযোগ্য উপাদান’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অন্য রাজনৈতিক দল বা নেতা তাদের স্বার্থ বা সংযোগের জন্য যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ কারণেই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার কাঠামোর প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

তৃতীয়ত, ভারতের ধারণা যে আওয়ামী লীগ এখনও তার প্রাচীন ভোটব্যাংকের মাধ্যমে সহজে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। ২০০১ বা ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতির পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট মৌলিকভাবে বদলে গেছে। গণহত্যা, গুম, গণগ্রেপ্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি দমননীতির স্মৃতি এখনও জনগণের মনোজগতে জীবন্ত। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের অনুপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, যুবসমাজ নতুন রাজনৈতিক বিকল্পের প্রতি আগ্রহী। বর্তমান প্রবাসী ভোটার ও তরুণ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ডিজিটালি সচেতন—এই নতুন প্রজন্মের সমর্থন আগের মতো নয়। ফলে আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোট ধারণা অতীতের হিসাব।

ভারতের কূটনীতিতে দেখা যায়, তারা এখনো চারপাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদাভিত্তিক ও স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও স্বাভাবিক ও সমানুভূতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। ভারতের জন্য শেখ হাসিনাকে ধরে রাখা এক ধরনের ‘রাজনৈতিক বিনিয়োগ’—যার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আবারও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

ভারত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা প্রকাশ করেছে। এই অনীহা থেকে বোঝা যায়, তারা এখনও পুরোনো মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে চায় না। নতুন সরকার যদি ভারতের সঙ্গে আপসের রাজনীতি অনুসরণ না করে, তবুও ভারত তাদের ‘পুরোনো বন্ধু’ হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এই ধরনের ধারাবাহিক প্রভাবকে সমর্থন করছে না।

বাংলাদেশের করণীয় হলো, প্রথমে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, পুরোনো অনুমান ও কৌশল দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। দেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংহতি বজায় রাখার জন্য ভারতকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বিভাজনভিত্তিক প্রভাব বিস্তার আর কার্যকর নয়। দ্বিতীয়ত, ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর ও টেকসই করতে হবে। আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম যেমন BIMSTEC, SAARC ও ASEAN–এ বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা ও প্রভাব বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশকে ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ হিসেবে দেখা হয়, শুধু ভৌগোলিক করিডোর নয়।

তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের কৌশল প্র্যাগম্যাটিক হেজিং হওয়া উচিত—অর্থাৎ অন্ধ আনুগত্য নয়, তেমনি অকারণ বৈরিতাও নয়। পানি, সীমান্ত, ট্রানজিট এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ‘লাল রেখা’ অটল রাখতে হবে, তবে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও বজায় রাখতে হবে।

পরিশেষে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় সম্ভাবনাময় দল, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে প্রস্তুত রাখতে হবে। তা না হলে হঠাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কৌশলগত ভুল শুধু রাজনৈতিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করবে না, জাতীয় স্বার্থের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আগাম প্রস্তুতি, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং পেশাদার কৌশলই ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সংকট এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত