প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আজও থেমে নেই। উপজেলা শহর ও এর পার্শ্ববর্তী ঢালুয়া এলাকা এক ধরনের নাশকতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে জনজীবনকে অশান্ত করে তুলছে। পুলিশের নজরদারি এবং বিভিন্ন দফায় গ্রেপ্তারের পরও সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কার্যক্রম থামছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢালুয়া এলাকা রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের কারণে নাঙ্গলকোটে ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আর্থিক ও নানাভাবে তরুণদের আন্দোলনে ব্যবহার করছেন।
গত ১৭ নভেম্বর নাঙ্গলকোটে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার ঢালুয়া ও নাঙ্গলকোটের বিভিন্ন সড়কে ঝটিকা মিছিল করেছে। এই মিছিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদ, কিন্তু তা পরিণত হয় সরকারবিরোধী স্লোগান, হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে। পুলিশের তৎপরতায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও এরপর থেকে নাঙ্গলকোট থানার ওসি ফজলুল হককে বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হুমকিসূচক বার্তায় বলা হয়েছে, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশিদের নাম জড়িত রয়েছে। শুধু কল নয়, পরিবারের সদস্যদের ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাঙ্গলকোটের নাশকতায় অর্থায়ন মূলত আসে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামালের মাধ্যমে। স্থানীয় ছাত্রদের অর্থের লোভ দেখিয়ে রাস্তায় নামানো হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার হলে তাদের পরিবারের ব্যয়ভার বহন করার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা ও পৌর এলাকার স্কুল শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত এ নাশকতায় জড়িত হচ্ছে। এই অর্থায়ন ও নির্দেশনার মাধ্যমে ঢালুয়া এলাকা রাজনৈতিক ক্যাডারদের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার ঢালুয়া এলাকায় ফ্যাসিবাদী দলের সাবেক এমপি জয়নাল আবদিনের প্রভাব তৈরি হওয়ার পর থেকেই এই এলাকা রাজনৈতিক কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান ভূঁইয়া বাসির এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ভূঁইয়া গোপনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কার্যক্রম সমন্বয় করছে। তাদের বাড়ি ঢালুয়াতেই অবস্থিত এবং নাফিসা কামালের নির্দেশ অনুযায়ী তারা বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন ও ঝটিকা মিছিল পরিচালনা করছেন।
সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সদস্য ইমরান হোসেন গ্রেপ্তারের পর জানান, তার মিছিল ও নাশকতায় অংশগ্রহণের নির্দেশ এসেছে তার পিতৃসন্তান ইসহাক মিয়ার মাধ্যমে, এবং তাতে অর্থায়ন করেছেন নাফিসা কামাল। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে, যা নিয়ে তরুণরা গর্ব প্রকাশ করত।
নাঙ্গলকোটের পুলিশ প্রশাসনও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ওসি ফজলুল হক বলেন, “ঢালুয়া থেকে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের বড় নেতারা সরাসরি অংশ নেন না, কিন্তু তাদের নির্দেশ এবং অর্থায়নের মাধ্যমে তরুণদের দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিভিন্ন হুমকির মুখে পড়তে হয়।” বিদায়ী পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান আরও জানান, “আমরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করি, এর জন্য অনেকেই বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছে। যেসব নম্বর থেকে হুমকি আসছে, তার বেশিরভাগই বিদেশি, তাই শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।”
স্থানীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাঙ্গলকোটে এই ধরনের নাশকতা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের সক্রিয় নজরদারি, স্থানীয় পুলিশের সতর্কতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সহযোগিতা না থাকলে এমন কার্যক্রম জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং শিক্ষা ও ব্যবসার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
নাশকতার এই ধারা কেবল অরাজকতা সৃষ্টি করছে না, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনে ভীতি, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপও তৈরি করছে। এটি পুলিশের কাজকে জটিল করছে এবং আইনের শাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চ্যালেঞ্জ ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নাশকতার সঙ্গে যুক্তদের চিহ্নিত করা, অর্থায়ন এবং নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান কঠিন।
পর্যবেক্ষকরা আরও মনে করেন, নাঙ্গলকোটের এই পরিস্থিতি একটি বড় রাজনৈতিক নিদর্শন। তরুণদের রাজনৈতিক কাজে অর্থ ও প্রভাবের মাধ্যমে ব্যবহার করা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পুলিশের ওপর হুমকি দেখানো, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের উপর চাপ তৈরি করা—সবই দেশের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিরোধে তৎপরতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তীব্র।
নাঙ্গলকোটের এই নাশকতার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, তরুণদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অর্থায়নমূলক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে, পুলিশি তৎপরতা, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা এবং সমাজের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া এলাকা এখন শুধুই একটি রাজনৈতিক হটস্পট নয়, এটি দেশের নিরাপত্তা, তরুণদের ভবিষ্যত এবং স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতার পরীক্ষা।