সায়েন্সল্যাবে ঢাকা কলেজ–আইডিয়াল কলেজে তীব্র সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
সায়েন্সল্যাবে ঢাকা কলেজ–আইডিয়াল কলেজে তীব্র সংঘর্ষ

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর শিক্ষাঙ্গনে ফের অশান্তির চিত্র। ঢাকা কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সায়েন্সল্যাব ও নিউমার্কেট এলাকা। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হওয়া ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারামারির ঘটনা বিকেল গড়ানো পর্যন্ত চলমান ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে। কী কারণে হঠাৎ করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে শুরু করে মিরপুর রোডের নিউমার্কেট অংশ পর্যন্ত একাধিক স্থানে শিক্ষার্থীদের দল বেঁধে অবস্থান নিতে। কোথাও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, কোথাও আবার লাঠিসোঁটা হাতে ধাওয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। সাধারণ মানুষ, দোকানদার ও পথচারীরা নিরাপত্তার জন্য দোকানপাট বন্ধ করে দ্রুত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। অনেকে আশপাশের গলি ও ভবনে আশ্রয় নেন।

সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ঢাকা কলেজের ভেতরে দুই রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে টিয়ারশেল নিক্ষেপের পরও পুরোপুরি শান্ত হয়নি পরিস্থিতি। কিছু শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও সতর্ক অবস্থান নেয়। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয় পুরো এলাকায়।

এই সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজধানীর যান চলাচলের ওপর। মিরপুর থেকে নিউমার্কেটগামী সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প সড়কেও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী যান আটকে পড়ে দীর্ঘ সময়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার একই এলাকায় এমন সংঘর্ষ রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কথাকাটাকাটি থেকে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা বড় আকার ধারণ করে এবং উভয় কলেজের শিক্ষার্থীরা দলে দলে জড়ো হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যদিও এর পেছনে পূর্বের কোনো বিরোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজক মন্তব্য কিংবা সামান্য ঘটনার রেশ আছে কি না—তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, সায়েন্সল্যাব এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থী সংঘর্ষের জন্য পরিচিত। ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা সিটি কলেজ—এই তিন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অতীতেও একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায়ই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়, যার মধ্যে টিয়ারশেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ ও শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

এই পুনরাবৃত্ত সংঘর্ষ ঠেকাতে গত ৯ নভেম্বর নিউমার্কেট থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি মৌখিক ‘শান্তিচুক্তি’ হয়েছিল। সেই সময় উভয় পক্ষই ভবিষ্যতে মারামারি ও সংঘর্ষে জড়াবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শিক্ষার্থীদের সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু শান্তিচুক্তির এক মাস না পেরোতেই ফের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এই সহিংসতার পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ। কৈশোর ও তারুণ্যের আবেগ, দলগত মনোভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আশপাশের কয়েকটি দোকান ও যানবাহনও। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রস্তুতিও চলছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার জায়গা হওয়া উচিত ক্যাম্পাস, সংঘর্ষের মাঠ নয়। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে এমন সহিংসতা আরও বাড়বে।

সবশেষে বলা যায়, ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের এই সংঘর্ষ শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এটি পুরো নগর জীবনের জন্য এক বড় সংকেত। শান্তিচুক্তি ভেঙে বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে, এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। না হলে সায়েন্সল্যাব ও আশপাশের এলাকা আবারও যে কোনো সময় অশান্তির আগুনে জ্বলতে পারে, আর তার মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত