প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আইনি সীমা অতিক্রম, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং ব্যক্তিগত মানসিক চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি ডাকসু থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সর্বমিত্র চাকমা।
ফেসবুক পোস্টে সর্বমিত্র চাকমা লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তাঁকে নির্বাচিত করেছেন এবং সেই নির্বাচনের পেছনে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি ক্যাম্পাসে রেজিস্টার্ড রিকশা চালুকরণ, যানবাহন সীমিতকরণসহ একাধিক প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
সর্বমিত্র চাকমা তাঁর পোস্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফিল্ডের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা। তিনি লেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় এই মাঠে এখনো পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা নেই, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরি, এমনকি সাইকেল চুরির মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। অথচ এই জায়গাটিই হওয়া উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও মুক্ত একটি পরিসর।
তিনি আরও বলেন, নারী শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে বারবার অভিযোগ করেছেন যে, বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যের কারণে তারা সেন্ট্রাল ফিল্ডে স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করতে পারেন না। অনেক সময় তারা হেনস্তার শিকার হন, যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক। ডিএমসি সংলগ্ন দেয়াল সংস্কারের একটি ফাইল প্রশাসন থেকে ফিরে আসার কথাও উল্লেখ করেন সর্বমিত্র চাকমা। তাঁর দাবি, ওই দেয়াল সংস্কার না হওয়ায় বহিরাগতরা সহজেই টপকে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও এই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, সেন্ট্রাল ফিল্ডে খেলতে আসা কয়েকজন কিশোর নিজেরাই কানে ধরে ওঠবস করছে এবং তাদের দিকে হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সর্বমিত্র চাকমা। এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে আইনবহির্ভূত ও অমানবিক আচরণ হিসেবে আখ্যা দেন।
এই প্রসঙ্গে সর্বমিত্র চাকমা তাঁর পোস্টে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, কানে ধরিয়ে ওঠবস করানোর ঘটনাটি ঘটেছিল গত মাসে, এমন এক সময় যখন ক্যাম্পাসে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর পন্থা হয়তো ভুল ছিল, কিন্তু প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য কোনো কার্যকর উপায় না থাকায় তিনি এমন কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, এই কঠোরতা ছাড়া বহিরাগতদের দমন করে সেন্ট্রাল ফিল্ডে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না।
সর্বমিত্র চাকমা আরও বলেন, তাঁর সমস্ত চিন্তা ও উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা। তিনি দাবি করেন, একা হাতে অনেক জায়গায় দায়িত্বের সীমা ছাড়িয়েও কাজ করার চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়েও সমাধান খুঁজেছেন, কারণ তিনি মনে করেছেন পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করতে হয়েছে, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক অবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।
ফেসবুক পোস্টে তিনি স্পষ্টভাবে লেখেন, আইন তো আইনই। দায়িত্ব পালনের সময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আইনি সীমা অতিক্রম করতে হয়েছে, যা তাঁর জন্য মানসিকভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় তাঁর পক্ষে আর দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করছেন। সে কারণেই তিনি ডাকসু থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্ত তিনি কোনো অভিমান থেকে বা কারও প্ররোচনায় নেননি।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদল ব্যবহারকারী সর্বমিত্র চাকমার কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন এবং বলেন, একজন ছাত্রনেতার এভাবে শাস্তিমূলক আচরণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার কেউ কেউ তাঁর উদ্দেশ্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে তিনি হয়তো চাপে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অধিকাংশ আলোচনাতেই উঠে আসে ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতার বিষয়টি।
ডাকসুর একজন কার্যনির্বাহী সদস্যের এমন আকস্মিক পদত্যাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এটি শুধু একজন ব্যক্তির পদত্যাগ নয়, বরং ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে ধরছে। দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাস শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগ সেই আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। ছাত্র প্রতিনিধিদের হাতে কতটুকু ক্ষমতা থাকা উচিত, আর প্রশাসনের দায়িত্বই বা কোথায় শেষ—এই প্রশ্নগুলো আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে একক উদ্যোগ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে।
সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসু বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে তাঁর এই ঘোষণার পর ক্যাম্পাসজুড়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সহজে থামবে বলে মনে হচ্ছে না। অনেকেই আশা করছেন, এই ঘটনার পর অন্তত ক্যাম্পাস নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রশাসন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, বরং সমন্বিত, আইনসম্মত ও টেকসই ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।