প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত তিন বছর মেয়াদি ফাজিল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে আবারও দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ঐতিহ্যবাহী ছারছীনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসা। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. শামছুল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, সার্বিকভাবে ভালো ফলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে ছারছীনা মাদ্রাসা তার ধারাবাহিক সাফল্যের ইতিহাস আরও একবার সুদৃঢ় করেছে।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এবারের ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মোট এক লাখ ৪৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন, যাদের মধ্যে এক লাখ ১১ হাজার ৯৯৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। ফলাফল স্থগিত রয়েছে ৩০৯ জন শিক্ষার্থীর। তিন বর্ষ মিলিয়ে পাসের হার ছিল সন্তোষজনক। প্রথম বর্ষে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ, দ্বিতীয় বর্ষে ৯৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং তৃতীয় বর্ষে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশিত ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ছারছীনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসার কৃতিত্ব। বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত কামিল মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় শীর্ষস্থান ধরে রাখছে। এবারের ফাজিল পরীক্ষাতেও তারা প্রথম স্থান অর্জন করে সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। শিক্ষাঙ্গনে অনেকেই এই সাফল্যকে ‘ছারছীনা মডেল’-এর বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দেখছেন, যেখানে শৃঙ্খলা, নিয়মিত পাঠদান ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হয়।
শুধু ছারছীনা মাদ্রাসাই নয়, একইসঙ্গে দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রতিষ্ঠানটিও ছারছীনা দরবার পরিচালিত একটি মাদ্রাসা। ফলে শীর্ষ দুটি অবস্থানেই ছারছীনা দরবার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য মাদ্রাসা শিক্ষাঙ্গনে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়, বরং একটি সুসংগঠিত শিক্ষা আন্দোলনের প্রতিফলন।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টা ও সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, ছারছীনা দরবার শরীফের সম্মানিত পীর সাহেব হুজুরের দোয়া, নসিহত ও সার্বিক তত্ত্বাবধান শিক্ষকদের ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি পাঠ্যসূচির প্রতি গভীর মনোযোগ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ আবাসিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী করে তুলেছে।
বিশেষ অবদান রেখেছেন ছারছীনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হযরত মাওলানা রুহুল আমিন আফসারী। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাগত মান উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলি বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে, দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আ. খ. ম. আবু বকর সিদ্দিকের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ইসলাহ ও আদব-কায়দা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
ছারছীনা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই ফলাফল কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়। এটি ছারছীনা মাসলাকের সুদীর্ঘ শিক্ষা ঐতিহ্য, শৃঙ্খলাবোধ এবং দ্বীনি মেহনতেরই উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তিনি বলেন, গ্রামীণ জনপদে অবস্থিত একটি প্রতিষ্ঠান হয়েও জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থান দখল করা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে। তাঁর মতে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম—ছারছীনার এই সাফল্য তারই প্রমাণ।
ফলাফল ঘোষণার পরপরই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার দেখা যায়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা ও দোয়ার বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ছারছীনা মাদ্রাসার শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তারা এই অর্জনকে নিজেদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ আরও বেড়েছে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ফলাফল মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তারা বলছেন, যদি পরিকল্পিত পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক এবং নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো যায়, তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছারছীনা ও দারুননাজাতের সাফল্য অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আল্লাহর রহমত ও দোয়ায় এই ধারাবাহিক সাফল্য ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ছারছীনার শিক্ষা আন্দোলন আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে ইসলামী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ইআইবির অধীনে পরিচালিত ফাজিল পরীক্ষার এবারের ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার সাফল্য নয়, বরং মাদ্রাসা শিক্ষার অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে