শবেবরাত : কেন কিছু মানুষ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ বার
শবেবরাত : কেন কিছু মানুষ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শবেবরাত মুসলমানদের জীবনে এক গভীর আত্মিক তাৎপর্যের রাত। এটি শুধু একটি তারিখ বা নির্দিষ্ট রাত নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, অনুশোচনা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহিমান্বিত সুযোগ। এই রাতকে বলা হয় ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের রাত। হাদিসে এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলার রহমত অবারিত ধারার মতো বর্ষিত হয় এবং অসংখ্য বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। এমনকি সেই সংখ্যাকে তুলনা করা হয়েছে বকরির গায়ের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষের সঙ্গে। এই বর্ণনা শবেবরাতের ব্যাপ্তি ও মহিমাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

কিন্তু এই সীমাহীন রহমতের মাঝেও একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা রয়েছে। এই রাতেও কিছু মানুষ আছেন, যাদের দিকে ক্ষমার দৃষ্টি ফিরে না। আল্লাহর দরবারে ক্ষমার দরজা খোলা থাকলেও তারা যেন নিজেরাই সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। বিষয়টি কেবল ভয় জাগানো নয়, বরং গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন; তবে মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে নয়।’ এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর হাদিসে শবেবরাতের মূল দর্শন নিহিত। এখানে ক্ষমার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের সঙ্গে নয়, বরং ঈমানের বিশুদ্ধতা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

প্রথম যে শ্রেণির মানুষ এই রাতে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়, তারা হলো মুশরিক। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা ইসলামের সবচেয়ে বড় গুনাহ। কারণ ক্ষমা চাওয়ার পূর্বশর্তই হলো, যাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তাঁকেই একমাত্র ক্ষমার মালিক হিসেবে স্বীকার করা। শিরকের মাধ্যমে মানুষ সেই মৌলিক স্বীকৃতিটাই ভেঙে ফেলে। ফলে শবেবরাতের রহমতও তার কাছে পৌঁছায় না।

তবে হাদিসে উল্লিখিত দ্বিতীয় শ্রেণিটি আরও বেশি চিন্তার কারণ। তারা হলো বিদ্বেষ পোষণকারী মানুষ। বাহ্যিকভাবে তারা মুসলমান, নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দোয়া করে, রাত জাগে। কিন্তু তাদের অন্তর ঘৃণা, হিংসা ও প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ। কারও প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ, অহংকার থেকে জন্ম নেওয়া শত্রুতা কিংবা বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিমান— এসবই মানুষকে ক্ষমার যোগ্যতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

বিদ্বেষ এমন এক অদৃশ্য ব্যাধি, যা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। মানুষ সিজদায় মাথা রাখে, কিন্তু তার হৃদয় বাঁকা থাকে। দোয়ার জন্য হাত তোলে, অথচ সেই হাতেই অন্যের প্রতি কঠোরতা ও অন্যায় লুকিয়ে থাকে। যেন আল্লাহ তাআলা এই রাতে বান্দাকে প্রশ্ন করেন— তুমি আমার ক্ষমা চাও, অথচ আমার বান্দাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত নও কেন?

এখানেই শবেবরাতের মূল নৈতিক শিক্ষা নিহিত। এটি শুধু নফল নামাজ, তিলাওয়াত বা দীর্ঘ দোয়ার রাত নয়। এটি হৃদয় শুদ্ধ করার রাত। সম্পর্কের জট খুলে দেওয়ার রাত। অহংকার ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার রাত।

আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয়— যে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না। তবে দুজন মানুষের মধ্যে শত্রুতা থাকলে বলা হয়, এ দুজনকে ছেড়ে দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে।’ যদি সাপ্তাহিক এই সাধারণ ক্ষমার দিনেও বিদ্বেষ ক্ষমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে শবেবরাতের মতো মহিমান্বিত রাতেও তা যে বড় অন্তরায় হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

এ ছাড়া আলেমদের ব্যাখ্যায় আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পিতা-মাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক অন্যায়ভাবে ছিন্ন করা, মানুষের অধিকার আত্মসাৎ করে তাওবা না করা— এসব অবস্থাও বান্দাকে আল্লাহর পূর্ণ রহমত থেকে বঞ্চিত করতে পারে। কারণ আল্লাহ তাঁর নিজের অধিকারের বিষয়ে ক্ষমাশীল হলেও, বান্দার হক আদায় না হলে সেই ক্ষমা থমকে যায়।

শবেবরাত তাই আমাদের সামনে এক নির্মম অথচ প্রয়োজনীয় আয়না ধরে। এই আয়নায় শুধু নামাজের হিসাব নয়, সম্পর্কের হিসাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা কাকে কষ্ট দিয়েছি, কার অধিকার নষ্ট করেছি, কাকে ক্ষমা করতে পারিনি— এই প্রশ্নগুলো এই রাতের নীরবতায় আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

এই রাত আমাদের শেখায়, ক্ষমা পেতে হলে ক্ষমাশীল হতে হয়। আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হলে আগে মানুষের দিকে এক কদম এগোতে হয়। অনেক সময় একটি আন্তরিক ‘মাফ করে দিন’— হাজার রাকাত নফল নামাজের চেয়েও বেশি ওজনদার হয়ে ওঠে।

সুতরাং শবেবরাতের প্রস্তুতি শুধু মসজিদে গিয়ে নয়, হৃদয়ের ভেতর শুরু হওয়া উচিত। শত্রুতা ঝেড়ে ফেলা, অহংকার নামিয়ে রাখা, ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানো— এগুলোই এই রাতের নীরব কিন্তু গভীর ইবাদত।

যেন এমন না হয়— রহমতের বৃষ্টি নামছে, অথচ আমরা বিদ্বেষের ছাতা খুলে দাঁড়িয়ে আছি। এই শবেবরাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা শুধু ক্ষমা চায় না, বরং ক্ষমা করতেও জানে। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত