প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির আমেজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোতে দীর্ঘ ছুটি কার্যকর হয়েছে। তবে কলেজে ছুটি শুরু হলেও বিদ্যালয় খোলা থাকবে আরও কিছুদিন। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী বাস্তবতা। কেউ পাচ্ছেন দীর্ঘ অবকাশের স্বস্তি, আবার কেউ রমজানের মধ্যেই চালিয়ে যাবেন নিয়মিত পাঠদান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ২০২৬ সালের সরকারি-বেসরকারি কলেজের ছুটির তালিকা ও বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কলেজগুলোতে পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতর ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি মিলিয়ে টানা ৩৯ দিনের অবকাশ শুরু হয়েছে। এই ছুটি চলবে ২৫ মার্চ পর্যন্ত। এরপর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে একদিন বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার সঙ্গে যুক্ত হবে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার। সব মিলিয়ে ২৯ মার্চ, রোববার থেকে আবার খুলবে দেশের কলেজগুলো।
এই দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন কলেজ ক্যাম্পাসে নেমেছে ভিন্ন এক আবহ। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরছেন। কেউ কেউ আবার এই সময়টাকে ব্যবহার করছেন পরীক্ষার প্রস্তুতি বা আত্মউন্নয়নের কাজে। অনেকের কাছে এটি ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি বিশেষ সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
কলেজের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলো নিয়েও আগ্রহের কমতি নেই। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানতে চাইছেন, তাদের জন্য ছুটি কবে শুরু হবে। নতুন ছুটির তালিকা অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ দিন ছুটি কমানো হয়েছে। ফলে রমজান মাসের প্রায় পুরো সময় বিদ্যালয় খোলা থাকবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ রমজান পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চালু থাকবে।
এ সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পাঠ্যসূচি সময়মতো সম্পন্ন করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ছুটি থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, এমন যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগের বছরের তুলনায় এখানে ১২ দিন ছুটি কমানো হয়েছে। শবে মেরাজ, জন্মাষ্টমী এবং আশুরাসহ কয়েকটি দিনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে রমজান মাসের অর্ধেকের বেশি সময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো খোলা থাকবে। এই সিদ্ধান্তে অনেক শিক্ষার্থী হতাশ হলেও শিক্ষা প্রশাসন মনে করছে, এটি শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে মাদরাসাগুলোতে রমজানের ছুটি শুরু হয়েছে আরও আগে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় রমজান উপলক্ষে ছুটি কার্যকর হয়েছে। ফলে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে রমজানের পরিবেশে নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ছুটির তালিকায় কলেজের অন্যান্য ছুটির বিষয়েও বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৪ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত মোট ১০ দিনের ছুটি থাকবে। এছাড়া দুর্গাপূজা, বিজয়া দশমী, প্রবারণা পূর্ণিমা ও লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে ১৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি থাকবে। বছরের শেষ দিকে শীতকালীন অবকাশ হিসেবে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১ দিনের ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের হাতে তিন দিন সংরক্ষিত ছুটি রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানপ্রধান এসব ছুটি ঘোষণা করতে পারবেন। এই ছুটি সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতি, স্থানীয় উৎসব বা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।
রমজানের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা বা বন্ধ রাখা নিয়ে সবসময়ই একটি ভারসাম্যের বিষয় থাকে। একদিকে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুশীলন ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘ সময় রোজা রেখে ক্লাস করা অনেক সময় কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই অনেক অভিভাবকই বিদ্যালয়ে পূর্ণ রমজান ছুটি দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
অন্যদিকে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে শিক্ষাবর্ষের কার্যকর সময় বাড়ানো জরুরি। এজন্য ছুটির সংখ্যা কমানো এবং পাঠদানের সময় বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ছুটি পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও স্কুলের শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছে তাদের ছুটির জন্য। অনেকেই বলছেন, রমজানে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়া তাদের জন্য বিশেষ আনন্দের।
এদিকে শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ছুটির এই নতুন বিন্যাস শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হলে এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, রমজানকে কেন্দ্র করে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয়েছে ভিন্নধর্মী ছুটির সূচি। কলেজগুলোতে দীর্ঘ ছুটি শুরু হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়টা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন বিশ্রামের, তেমনি আত্মশুদ্ধি ও প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।