প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক প্রকার নতুন প্রত্যাশা ও আশা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়ে দেশের অর্থনীতি স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার আস্থা সংকটের কারণে এ সময়ে যথাযথ পরিমাণে বিদেশি বিনিয়োগ দেশে প্রবেশ করেনি, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুটোই কিছটা সংকোচনের শিকার হয়েছে। অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান এই সময়কালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেছেন এবং বলেছেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বেকার।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি সামাজিক জীবনে সহিংসতা, নিরাপত্তা সংকট এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে দেশে বিনিয়োগ পরিবেশও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। এসব কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃপ্রবাহী বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হয়েছে। তবে নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের পর জনগণের প্রত্যাশা কেন্দ্রীভূত হয়েছে তিনটি মূল বিষয়ে। প্রথমে, অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মানুষের আয় বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এবং তৃতীয়ত, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে কমানো।
অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, “মানুষের প্রত্যাশা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নয়; তাদের অর্থনৈতিক জীবনেও স্বস্তি ফিরে আসা জরুরি। দেশের বিভিন্ন খাতে স্থবিরতা ও অস্থিরতা কাটিয়ে নতুন গতি আনতে হবে। নতুন সরকারকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যা বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।”
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদহার কমানো এবং প্রণোদনামূলক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা যেমন সুনির্দিষ্ট নীতি ও স্থিতিশীল পরিবেশ আশা করে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতি ধারাবাহিকতা দেখতেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এই দুই দিকেই সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যা যেমন ঋণের ভার বৃদ্ধি, রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়া, এবং আয়-সম্পদের অসমতা দেশের অর্থনৈতিক সুস্থতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেলিম জাহান মনে করেন, সরকারকে এসব অসমতা কাটিয়ে তোলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, “দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে জীবিকা নির্বাহ করছে, আর ছয় কোটির মতো মানুষ এখনও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু আয়ের অসমতা নয়, সম্পদ এবং সুযোগের বৈষম্যও বড় সমস্যা।”
অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ বা ঢাকার আশপাশের তুলনায় অনেক অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত। সুষম উন্নয়নের জন্য সরকারকে অর্থ বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে শুধু আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টন নয়, সুযোগের সমতা সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, “সুষম উন্নয়ন বলতে শুধুমাত্র ধন-সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমতা তৈরি করাও অন্তর্ভুক্ত।”
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়মের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে, তবে তাদের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হয়নি। অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং ঋণ খেলাপির সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে সেলিম জাহান আশাবাদী যে, নিয়মকানুন কার্যকর করা এবং শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করলে আর্থিক খাত পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
নতুন সরকারের হাতে দেশের জনগণের এবং বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা বড়। এ প্রত্যাশার সঙ্গে সামাজিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি এবং দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানও জড়িত। অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, “নতুন সরকারকে সুষম উন্নয়নে জোর দিতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনগণের আয় বৃদ্ধি মিলিয়ে এটি সম্ভব।”
শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিই নয়, বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের স্থিতিশীল নীতি, সুশাসন ও সামাজিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারি খরচ কমানো, ঋণের ভার হ্রাস এবং আর্থিক খাতে নিয়মকানুন কার্যকর করা অপরিহার্য।
সেলিম জাহান আরও বলেছেন, “মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট—নতুন সরকার দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমবে। এটি অর্জন করতে হলে সরকারের দৃষ্টি দেশব্যাপী সুষম উন্নয়নের দিকে স্থির হতে হবে।”
নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের জনগণের মধ্যে আশা ও আস্থা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। মানুষের বিশ্বাস, নতুন সরকারে নীতি ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এই প্রত্যাশার সঙ্গে সামাজিক শান্তি, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা মিলিয়ে দেশ এক নতুন উন্নয়নের পথে এগোবে।