প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, মানোন্নয়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আন্দোলন বা মব সৃষ্টি করে পরীক্ষা বন্ধ করা কিংবা অটো পাস নেওয়ার সংস্কৃতি কখনোই কাঙ্ক্ষিত ছিল না এবং বর্তমান সরকার এ ধরনের যেকোনো অনিয়ম বা চাপের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় কার্যদিবসে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে জানান, শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল ও যুগোপযোগী কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে যেসব কারণে অটো পাস বা পরীক্ষা বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়ে এখন আর ফিরে তাকাতে চান না। বরং বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং ভিশন অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা ও মান নিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বিশেষভাবে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সতর্কতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ ও পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনো ধরনের প্রশ্নফাঁস, বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আরও জানান, পরীক্ষা যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত পর্যায়ে আলোচনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ড. এহছানুল হক মিলন। তিনি তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, অতীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মতে, শিক্ষা বোর্ড একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, শিক্ষকরা মূলত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নে মনোযোগ দেবেন, আর প্রশাসনিক দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পালন করবেন।
তিনি শিক্ষকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, শিক্ষকরা জাতি গঠনের প্রধান কারিগর। তাদের ন্যায্য দাবি ও সমস্যার বিষয়টি সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে। তবে দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে আন্দোলন করা বা শিক্ষাব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করা কাম্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই সবচেয়ে কার্যকর এবং ইতিবাচক পথ।
বর্তমান পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিদ্যমান পাঠ্যক্রমের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী রাখতে হলে নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন ও সংশোধন করা জরুরি। এই কাজে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এর বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষক এবং সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। সরকার এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে অটো পাস নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত পড়াশোনার গুরুত্ব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
করোনা মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অটো পাস দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই সিদ্ধান্ত তখনকার পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ছিল, তবে এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রকৃত মূল্যায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন অনেক শিক্ষাবিদ। ফলে এখন শিক্ষাব্যবস্থাকে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিভাবকদের মধ্যেও শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, পরীক্ষার মান এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব বাড়বে এবং তারা আরও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে এই ঘোষণা কিছুটা উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছে, শিক্ষাব্যবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির মাধ্যমে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা হলে শিক্ষার্থীরা সহজেই এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে পরীক্ষার স্বচ্ছতা, পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য এই বিষয়গুলোকে নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
ড. এহছানুল হক মিলন তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ইতিবাচক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রশাসন—সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠবে।
নতুন শিক্ষামন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থান দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।