আন্তর্জাতিক অনুদান পেল চুয়েটের চার উদ্ভাবক শিক্ষার্থী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
আন্তর্জাতিক অনুদান পেল চুয়েটের চার উদ্ভাবক শিক্ষার্থী

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) চার শিক্ষার্থী ধানের খোসার ছাই ব্যবহার করে আর্দ্রতা অপসারণকারী এক বিশেষ যন্ত্র উদ্ভাবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই গবেষণামূলক প্রকল্পে তারা আমেরিকান সোসাইটি অব হিটিং, রেফ্রিজারেটিং অ্যান্ড এয়ার-কন্ডিশনিং ইঞ্জিনিয়ার্স (ASHRAE)-এর অধীনে প্রদত্ত স্নাতক পর্যায়ের যন্ত্রপাতি অনুদান কর্মসূচি থেকে ২,০৫০ মার্কিন ডলার অনুদান অর্জন করেছেন।

প্রকল্পটির শিরোনাম “মাল্টি-লেয়ার ফিক্সড-বেড ডেসিক্যান্ট ডিহিউমিডিফায়ার ইউজিং রাইস হাস্ক অ্যাশ”। এটি মূলত একটি বহু-স্তর বিশিষ্ট স্থির বেডের যন্ত্র, যা বাতাস থেকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করতে সক্ষম। গবেষণাটি জটিল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন ও সাশ্রয়ী সমাধান প্রদান করছে।

প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে রয়েছেন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সজল চন্দ্র বণিক। গবেষণা দলে অংশগ্রহণ করছেন ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের চার শিক্ষার্থী: অর্ণব সাহা, মো. রেজওয়ানুল আবেদীন তৌফিক, মীর মোস্তফা তাহমিদ এবং অরুণাভ ভট্টাচার্য। তাদের মধ্যে একজন রেজওয়ানুল আবেদীন বলেন, “আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো একটি স্বল্প খরচে কার্যকর আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র তৈরি করা। ধানের খোসার ছাই ব্যবহার করে আমরা একটি বহু-স্তর বিশিষ্ট স্থির বেডের ডিহিউমিডিফায়ার উদ্ভাবন করেছি, যা বাতাস থেকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে দিতে সক্ষম।”

তিনি আরও জানান, “বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট আর্দ্রতার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্দ্রতা কম বা বেশি হলে পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে। এই সমস্যা সমাধানে আমাদের উদ্ভাবিত যন্ত্র বিশেষভাবে কার্যকর হবে। এছাড়া, এটি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ব্যয়বহুল প্রযুক্তির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য বিকল্প।”

যন্ত্রটির কাজের প্রক্রিয়া অত্যন্ত উদ্ভাবনী। আর্দ্র বাতাস যন্ত্রের ভিতরে প্রবেশ করলে ধানের খোসার ছাইতে থাকা উচ্চমাত্রার সিলিকা বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প শোষণ করে, ফলে শুকনো বাতাস নির্গত হয়। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে না, বরং পরীক্ষাগার বা শিল্পক্ষেত্রে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের খরচও কমায়।

ড. সজল চন্দ্র বণিক জানান, “আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো ASHRAE এবং চুয়েটের পক্ষ থেকে এই গ্রান্ট অর্জন করেছে। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা প্রদর্শন করছে না, বরং চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার ধারাকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও এই ধারা অব্যাহত রাখবে।”

অ্যাশরেই মূলত হিটিং, ভেন্টিলেশন এবং রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তির মান নির্ধারণ এবং গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। তারা বিশেষভাবে শিক্ষার্থীদের ল্যাবভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন করে থাকে, যা শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক।

চুয়েটের এই চার শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনী প্রকল্প শুধুমাত্র দেশীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীর দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা তুলে ধরেছে। ধানের খোসা, যা সাধারণত কৃষি বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেটিকে ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা এই গবেষণার অন্যতম সাফল্য। এটি পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ বর্জ্য পদার্থকে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের গবেষণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী মনোভাব এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এখন আন্তর্জাতিক গবেষণার সুযোগ পেতে পারছে, যা দেশের প্রযুক্তি খাত ও শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

রেজওয়ানুল আবেদীন আরও বলেন, “আমাদের এই যন্ত্রটি যদি শিল্পায়িত করতে পারি, তাহলে এটি আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে পারে। এটি গবেষণার পাশাপাশি ব্যবসায়িক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কম খরচে কার্যকর সমাধান প্রদান করে।”

চুয়েটের এই অর্জন বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। এই ধরনের গবেষণা দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন যে, সীমিত সম্পদ এবং স্বল্প খরচেও আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবনী গবেষণা সম্ভব।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সাফল্য প্রদর্শিত হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিশ্বস্ততার পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। এটি প্রমাণ করে, যে সৃজনশীল চিন্তা এবং উদ্ভাবনী মনোভাবের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ থেকেও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

চুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই উদ্ভাবন কেবল প্রযুক্তিগত নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রটি গবেষণা, শিল্প এবং শিক্ষার পাশাপাশি মানবজীবনের নানা ক্ষেত্রেও কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী দক্ষতা, দেশপ্রেম এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি তৈরির মনোভাবের চমকপ্রদ উদাহরণ।

এই ধরনের প্রকল্প দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও নতুন উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত