হেলমেট পরে ক্লাসে জবি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
জবি পলেস্তারা খসে আহত শিক্ষার্থী

প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে দুই শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে ক্লাস ও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা—হেলমেট পরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে তারা তুলে ধরেছেন নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব চিত্র।

বুধবার (১ এপ্রিল) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের একটি সেমিনার কক্ষে হঠাৎ করেই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধ্বংসাবশেষ তাদের ওপর এসে পড়ে। এতে আহত হন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের দুই শিক্ষার্থী তানভীর নিয়াজ ফাহিম ও মাহফুজুর রহমান মিতুল। আহতদের মধ্যে একজনের ব্যক্তিগত ল্যাপটপও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পরপরই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়।

ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) গণিত বিভাগের ১৮তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে হেলমেট পরে উপস্থিত হন। তারা জানান, এটি কোনো হাস্যরস বা অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনী নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। পরীক্ষার হলে হেলমেট পরে বসার ছবিটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

গণিত বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান নয়ন বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরেই ঝুঁকির মধ্যে ক্লাস করছি। গতকাল দুইজন সহপাঠী আহত হওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আমরা প্রতীকীভাবে হেলমেট পরে ক্লাসে বসেছি, যাতে সবাই বুঝতে পারে আমরা কতটা অনিরাপদ অবস্থায় আছি।”

শিক্ষার্থীদের দাবি, এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। প্রায় এক মাস আগে এক শিক্ষকের কক্ষেও পলেস্তারা খসে পড়েছিল। এছাড়া তারা অভিযোগ করেন, ২০১৫ সালেই সংশ্লিষ্ট ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় একই ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর ভবনের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে তারা মনে করছেন।

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেরানীগঞ্জে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। তারা মনে করেন, দ্রুত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করার প্রয়োজন হতো না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা হেলমেট পরেছিলেন কি না, তা তার নজরে আসেনি। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তরের পরিদর্শনে বিভাগের তিনটি ক্লাসরুম ও দুটি ল্যাবকে ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ মূলত প্রতীকী প্রতিবাদ, যা তাদের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

তিনি আরও জানান, সেমিনার কক্ষ এবং শিক্ষকদের বসার কিছু জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষকদের অন্যত্র স্থানান্তরের প্রক্রিয়াও চলছে। একই সঙ্গে ভবন সংস্কারের কাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অনেক ক্ষেত্রে ভবনের মূল কাঠামোর ফাটলগুলো ফলস সিলিংয়ের আড়ালে ঢাকা থাকায় আগে থেকে ঝুঁকি নির্ণয় করা কঠিন ছিল। বর্তমানে সিলিং সরিয়ে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অবস্থান করেন, সেখানে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের হেলমেট পরে ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই এটিকে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখছেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের উদ্বেগ ও দাবি তুলে ধরেছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতীক হিসেবেও উল্লেখ করছেন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নন। তারা দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান। তাদের মতে, সাময়িক সংস্কার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এই ঘটনার মাধ্যমে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি শিক্ষার্থীদের আহ্বান—শিক্ষার পরিবেশ যেন কখনোই জীবনের ঝুঁকির কারণ না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত