প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৬ এপ্রিল ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের প্রতিনিধিদলের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা। একই সঙ্গে তারা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন। তারা দাবি করেন, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা নয়, বরং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদকে দমন করার অংশ।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। কলেজের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়ম, নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং এসব বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো শিক্ষক ও কর্মচারীদের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে ১০ থেকে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ওবায়েদ মুহম্মদ বাসেত ঠাকুরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে প্রকাশিত অভিযোগের বিষয়ে প্রকৃত তথ্য জানা।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিনিধিদল অধ্যক্ষের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং প্রতিনিধিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এমনকি তারা নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং এক পর্যায়ে বিষয়টি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কলেজের ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট কিছু নেতা-কর্মী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের একটি দল মিছিল নিয়ে উপাধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে তারা প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ওপর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। হঠাৎ এই হামলায় উপস্থিত ব্যক্তিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
এই হামলায় অন্তত সাত থেকে আটজন আহত হন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন মিরপুর এলাকার একজন শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী আব্দুল মান্নান, প্রাক্তন ছাত্র আবু সাঈদ এবং এমপির মুখপাত্র ডা. মঈন উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন। তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, আহত ব্যক্তিরা যখন চিকিৎসা নিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বিষয়টিকে তারা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী নেতারা এই ঘটনাকে ‘ন্যক্কারজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে শুধু একটি প্রতিনিধিদলের ওপর হামলা হয়নি, বরং শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপরও আঘাত হানা হয়েছে।
বিবৃতিতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কলেজে বিদ্যমান সব ধরনের অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রভাব দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। এই ধরনের সংঘর্ষ শুধু শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সংঘটিত এই হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হয় কি না।