পটুয়াখালীতে মুগডালের বাম্পার ফলনে কৃষকের হাসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ১৬ বার
পটুয়াখালীতে মুগডালের বাম্পার ফলন, লাভে কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজ আর সোনালি রঙের এক অন্যরকম উৎসব। দিগন্তজোড়া জমিতে পেকে উঠেছে মুগডাল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্ষেত থেকে ডাল সংগ্রহে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেউ ক্ষেত থেকে মুগডাল তুলছেন, কেউ উঠানে শুকাচ্ছেন, আবার কেউ বাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নতমানের বীজ এবং কম পোকামাকড়ের আক্রমণের কারণে চলতি মৌসুমে পটুয়াখালীতে মুগডালের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে কৃষকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।

দেশের সবচেয়ে বেশি মুগডাল উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত পটুয়াখালী। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া ডাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে ধান কাটার পর জমিতে খুব কম খরচে মুগডাল চাষ করা যায় বলে উপকূলীয় কৃষকদের কাছে এটি এখন লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এবার ফলনের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে গত বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠে মাঠে এখন মুগডাল সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষকেরা। কেউ হাতে ডাল তুলছেন, কেউ শুকানোর জন্য মাড়াই করছেন। গ্রামের উঠানজুড়ে দেখা যাচ্ছে শুকাতে দেওয়া ডালের স্তূপ। কৃষকদের চোখেমুখে স্পষ্ট স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া ছিল মুগডাল চাষের অনুকূলে। অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা খরার মতো কোনো বড় সমস্যা হয়নি। একই সঙ্গে পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম ছিল। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে এসেছে, আর ফলন বেড়েছে আশানুরূপভাবে।

কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, ধান কাটার পর জমিতে একটি হাল চাষ দিয়েই মুগডাল বপন করা যায়। এতে অতিরিক্ত সেচ বা সার খুব বেশি লাগে না। খরচ কম হলেও এবার ফলন অনেক ভালো হয়েছে। বাজারে দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। তাই লাভের পরিমাণও বেশি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

আরেক কৃষক আবু জাফর বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন অনেক বেশি। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ডাল বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। তিনি জানান, মুগডালের দামও এখন ভালো। ফলে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছু সঞ্চয়ও করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবার প্রতি একর জমিতে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর যেখানে প্রতি মণ মুগডাল ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এবার বাজারে দাম উঠেছে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুগডাল শুধু লাভজনক ফসলই নয়, এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডাল জাতীয় ফসল মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ায়, যা পরবর্তী ফসল উৎপাদনে সহায়ক হয়। ফলে কৃষকেরা একই জমিতে পরবর্তী সময়ে ধান বা অন্যান্য ফসল চাষে ভালো ফলন পান।

পটুয়াখালীর মুগডাল এখন শুধু দেশের চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার মুগডাল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। মান ও স্বাদের কারণে বিদেশি বাজারেও এই ডালের আলাদা কদর তৈরি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের উন্নতমানের বীজ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে পটুয়াখালী জেলায় ৮৬ হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে মুগডাল চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন প্রায় ৮৭ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি জেলার কৃষি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পটুয়াখালীর মুগডালের গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে ডাল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় বাজারেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়েছে। কৃষকদের হাতে নগদ অর্থ আসায় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তবে কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত গুদাম না থাকায় কৃষকদের খোলা জায়গায় ডাল শুকিয়ে রাখতে হয়। এছাড়া পরিবহন খরচও বাড়ছে। তারা সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে মুগডাল চাষ সম্প্রসারণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও রফতানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও কম খরচে অধিক লাভজনক এই ফসল গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে কৃষকদের সফলতায় আশাবাদী স্থানীয় প্রশাসনও। তারা বলছেন, কৃষকদের উৎপাদিত ডালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির আওতায় আনতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর এমন ফলন তাদের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও এবার মুগডালের ক্ষেত যেন তাদের জীবনে আশার আলো হয়ে এসেছে। মাঠের প্রতিটি পাকা ডাল এখন তাদের কাছে শুধু ফসল নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত