প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আর্থিক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এপ্রিল মাস শেষে ব্যাংকখাত থেকে সরকারের মোট ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। এই সংখ্যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর তুলনায় একটি স্বস্তির বার্তা বহন করলেও, অর্থনীতির গভীরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণের প্রবণতা এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই মোট ঋণের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই। সাধারণভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ কমে যাওয়া একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় এই ইতিবাচক দিকটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ নাগাদ এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে আরও প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকখাত সরকারের জন্য একটি নিরাপদ ও সহজলভ্য অর্থের উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের জমা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। তখন মোট ব্যাংক ঋণ ছিল ৬৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা বাজেট সহায়তার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে এই ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা সরকারের আর্থিক চাপের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তীতে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে কিছুটা সমন্বয়ের মাধ্যমে ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় সরকার সহজেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছে। এতে বাজারে তারল্যের কোনো সংকট তৈরি হয়নি। বরং ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে থাকা অর্থ ব্যবহারের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
তাদের মতে, ব্যাংকখাত থেকে ঋণ নেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি অর্থ নেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলে তা মূলত বিদ্যমান অর্থের পুনর্বণ্টন, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানে নতুন টাকা ছাপানো বা অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি করা। এই প্রক্রিয়া সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ এমন খাতে ব্যয় করা উচিত, যেখান থেকে ভবিষ্যতে আয় সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অর্থকে অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু যদি এই অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়, বেতন বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।
বর্তমানে সরকার বাজেট সহায়তার জন্য ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে একদিকে ঋণ গ্রহণের চাপ কমানো সম্ভব হলেও, অন্যদিকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের চাপও বজায় রাখতে হচ্ছে।
এদিকে আর্থিক খাতের অন্য সূচকগুলো কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। একইসঙ্গে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। মে মাসের প্রথম তিন দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ৩১ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার যোগানকে আরও মজবুত করছে।
তবে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, শুধু ব্যাংক ঋণ কমে যাওয়াই স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নয়। রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। একইসঙ্গে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা প্রদান করা জরুরি। এতে করে ব্যাংকখাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতির ভেতরের গতি ফিরে আসবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ব্যাংকখাতে সরকারের ঋণ কিছুটা কমলেও এটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার মধ্যে। সঠিক নীতি গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব, অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে পারে দেশ।