হরমুজ উত্তেজনায় আমিরাতে হামলা ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
হরমুজ প্রণালি উত্তেজনা ২০২৬

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যেকোনো ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে বড় সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় একাধিক ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি, ফুজিরাহ বন্দরের তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং পাল্টাপাল্টি হুমকিতে পুরো অঞ্চল এখন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, ইরান থেকে ছোঁড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ধ্বংস করেছে। যদিও এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, জ্বালানি স্থাপনায় কোনো পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়নি। বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য তিনি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিক দুঃসাহসিকতাকে’ দায়ী করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি রুট। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বাড়তে শুরু করেছে।

ফুজিরাহ বন্দরের তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে বন্দরের একটি অংশে বিশাল অগ্নিকাণ্ড দেখা গেছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি, তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের হামলা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ ফুজিরাহ বন্দর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানকার অস্থিরতা আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে উত্তেজনার মধ্যে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো মার্কিন নৌ-জাহাজের ওপর হামলা হলে ইরানকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে’। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, এমন হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, ইরানের কয়েকটি ছোট নৌকা মার্কিন বাহিনীর কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নৌকাগুলো আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে আসছিল এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছিল।

অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তপ্ত করে তুলছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতি ও আগ্রাসী অবস্থানের কারণেই অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে। ইরানের কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে।

তবে পুরো পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। তার মতে, সংঘাতের পথ এড়িয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে।

আরাগচি আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আলোচনা চলছে এবং সেখানে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইসলামাবাদ ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং উত্তেজনা কমাতে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, উপসাগরীয় অন্যান্য দেশও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘও উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল। কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। তার ওপর সামরিক মহড়া, নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আস্থার সংকট গভীর হয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেকেই নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবাসীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব সম্প্রদায় এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা থাকলেও যুদ্ধের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত