চাটমোহরে উদ্ধার দেড় হাজার বছরের পুরোনো বিষ্ণুমূর্তি: ইতিহাসে নতুন আলোচনার সূত্রপাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৪২ বার

প্রকাশ: ২৫শে জুলাই, ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করলো পাবনার চাটমোহর উপজেলার একটি গ্রাম। শুক্রবার সকালে উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের মাঝগ্রামে স্থানীয় এক ব্যক্তি তার পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে উদ্ধার করেন একটি কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি, যেটি ধারণা করা হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো।

চাটমোহর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনজুরুল আলম জানান, ওই দিন সকাল বেলা মাঝগ্রামের বাসিন্দা লোকমান হোসেন তার নিজ পুকুরে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। জালে আকস্মিকভাবে শক্ত কোনো বস্তু আটকা পড়ে। প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি সেই বস্তুটি উপরে তুলে আনেন। পরে দেখা যায়, সেটি একটি প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে মূর্তিটি থানায় নিয়ে আসা হয়, এবং এরপর স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, “এই বিষ্ণুমূর্তিটি শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক মূল্যবান নিদর্শন। ধারণা করা হচ্ছে এটি গুপ্ত যুগ বা প্রাক-পাল আমলের। প্রাথমিকভাবে এটিকে দেড় হাজার বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে চূড়ান্ত সময়কাল নির্ধারণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।”

তিনি আরও জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং মূর্তিটি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগের যৌথ নিরাপত্তায় মূর্তিটি এখন সংরক্ষিত রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া বিষ্ণুমূর্তিটি শুধু একটি ধর্মীয় নিদর্শন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মত দিয়েছেন ঐতিহাসিক ও গবেষকরা। কষ্টিপাথরের নিপুণ কারুকাজে নির্মিত মূর্তিটি বিষ্ণুর চার বাহু ও প্রতীক ধারণের প্রমাণ বহন করছে। মূর্তির নির্মাণশৈলী দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো রাজদরবার বা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপাসনালয়ের অংশ হতে পারে, যা ওই অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার অবস্থান ও বিস্তৃতি সম্পর্কে নতুন তথ্য তুলে ধরবে।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা এই ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে দেখছেন। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, পূর্বপুরুষদের মুখে তাঁরা এই অঞ্চলে এক সময় অনেক প্রাচীন স্থাপনার কথা শুনেছেন, কিন্তু এই প্রথমবার চোখের সামনে এমন মূল্যবান কিছু দেখতে পেলেন। অনেকে মূর্তির চারপাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনাও করেছেন।

চাটমোহর, যা আগে থেকেই ইতিহাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই ধরনের আবিষ্কার আরও বহু অজানা ইতিহাসের দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাচীন মূর্তি বা স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া গেলেও এতো সংরক্ষিত ও সুস্পষ্ট নিদর্শন খুব কমই উদ্ধার হয়েছে।

এই বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধারের ঘটনাটি শুধু চাটমোহরের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এই ধরনের নিদর্শনগুলি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে দেশের হারানো ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা যায়।

বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারিতে মূর্তিটি নিরাপদে রাখা হয়েছে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল খুব শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবে বলে জানা গেছে। তারা মূর্তিটির প্রকৃত সময়কাল, শিল্পরীতি, এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

চাটমোহরের মাঝগ্রামে এই ঐতিহাসিক উদ্ধার নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ঘটনা, যা দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলো সময় ও জাতিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত