মাদারীপুরে হামে আক্রান্ত ৩৬৫ ছাড়াল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদারীপুর জেলায় হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৬৫ জন ছাড়িয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে চাপ বেড়েছে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আক্রান্তদের মধ্যে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর অবস্থায় থাকা বেশ কয়েকজন রোগীকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মাদারীপুর সদর হাসপাতালে গত কয়েক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে তিন শিশুসহ মোট ৩২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ১৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের রোগীদের জন্য আলাদা একটি আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়েছে। সেখানে শিশু রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসক ও নার্সরা দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে শিশুদের সংক্রমণ ঝুঁকি বেশি হওয়ায় তাদের আলাদা করে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

চিকিৎসা বিভাগ জানায়, এ পর্যন্ত অন্তত ৩৬ জন রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর ও জটিল ত্বকের সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় এসব রোগীকে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। ইটেরপুল এলাকা থেকে আসা শিশু আরশির পরিবার জানান, হঠাৎ করেই কাশি ও বমির সমস্যা শুরু হয় এবং শরীরে ছোট ছোট দাগ দেখা দেয়। প্রথমে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চার দিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখন তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে পরিবার জানায়।

অন্যদিকে লঞ্চঘাট এলাকার আরেক শিশু জোবায়েরের মা জানান, টিকা নেওয়ার পরও তার সন্তান আক্রান্ত হওয়ায় প্রথমে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর বর্তমানে শিশুটির অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হওয়ায় পরিবারগুলোর মধ্যে মানসিক ও আর্থিক চাপ বেড়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হামের সংক্রমণ সাধারণত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়ায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীরা সুস্থ হয়ে ওঠে। এ কারণে আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অখিল সরকার জানিয়েছেন, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করা জরুরি। তিনি বলেন, শিশুদের শরীরে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা ত্বকে দাগ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়ানো এবং বিশ্রামে রাখা প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সদর হাসপাতালে হামের টিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে। তাই রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে এবং আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনসচেতনতার অভাব এবং টিকাদানে কিছুটা গাফিলতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক শিশু সময়মতো সম্পূর্ণ টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে হামের প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন, ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করা হয়েছে এবং আক্রান্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

মাদারীপুরের এই পরিস্থিতি আবারও শিশুদের টিকাদান ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দ্রুত পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত