প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সবজি ও ডিমের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। টমেটো, কাঁচা মরিচ, বেগুনসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন বাজার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। একই সঙ্গে ডিমের দামও বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। তবে তুলনামূলক স্বস্তি দেখা গেছে মুরগি ও চালের বাজারে, যেখানে কিছু পণ্যের দাম কমেছে।
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দাম আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রেতারা জানান, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ায় বাজার করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন বেসরকারি চাকরিজীবী ক্রেতা সাব্বির হোসেন বলেন, বাজারে গিয়ে তিনি প্রয়োজনের অর্ধেক পণ্যও কিনতে পারেননি। তার মতে, আয় একই থাকলেও নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিন বাড়ায় সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, টমেটোর দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও একই হারে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। পেঁয়াজ ৫০ টাকা, আদা ২১০ থেকে ২২০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ টাকায় এবং কাঁকরোল ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাজারে সবজির এই দামের ওঠানামা ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি বাজারে এই অস্থিরতার প্রধান কারণ। কারওয়ান বাজারের এক সবজি বিক্রেতা আনিস জানান, বৃষ্টি ও পরিবহন জটিলতার কারণে পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, ফলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তাদের দাবি, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।
সবজির পাশাপাশি ডিমের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। লাল ডিমের ডজন ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি দামে বৃদ্ধি পাওয়ায় খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। ডিম বিক্রেতা সোলায়মান বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে সাধারণ ক্রেতারা এই পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, আগের তুলনায় একই বাজেটে বাজারের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। একজন ক্রেতা নাসরিন আক্তার বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় ডিম ও সবজি কিনতে গিয়েও এখন হিসাব করতে হচ্ছে।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে মুরগির বাজারে। সপ্তাহ ব্যবধানে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, ব্রয়লার ১৭০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় দাম কমেছে এবং তা সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে চালের বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। নতুন মৌসুমি চাল বাজারে আসার ফলে ব্রি ২৮ ও পাইজাম চালের দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে ব্রি ২৮ চাল ৫৫ টাকা এবং পাইজাম ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাল ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন ধান আসার কারণে সরবরাহ বাড়ায় দামে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজারে এ ধরনের ওঠানামা সাধারণত সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং মৌসুমি প্রভাবের কারণে হয়ে থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবজি ও ডিমের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের এই অস্থিরতা সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে একদিকে সবজি ও ডিমের দাম বাড়ায় চাপ তৈরি হলেও অন্যদিকে মুরগি ও চালের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের বাজার এখনও স্থিতিশীল হয়নি বলে মনে করছেন ক্রেতা ও বিশ্লেষকরা।