কঙ্গোয় ইবোলা আতঙ্ক: হাসপাতাল থেকে পালাল ১৮ রোগী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৭৬ বার
কঙ্গোয় ইবোলা আতঙ্ক: হাসপাতাল থেকে পালাল ১৮ রোগী

প্রকাশ:  ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে আবারও ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করেছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মংবওয়ালু শহরে একটি ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর অন্তত ১৮ জন সন্দেহভাজন ইবোলা রোগী পালিয়ে যাওয়ার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, পালিয়ে যাওয়া এসব রোগীর এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

স্থানীয় হাসপাতাল পরিচালক ডা. রিচার্ড লোকুদি জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা চালায়। হামলাকারীরা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ পরিচালিত একটি চিকিৎসা তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই তাঁবুতেই নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন ইবোলা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। হঠাৎ হামলা ও আগুনের ঘটনায় চিকিৎসাকেন্দ্রে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রোগী, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সেই সুযোগে ১৮ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় কেউ নিহত বা গুরুতর আহত না হলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ ইবোলা ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক এবং আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পালিয়ে যাওয়া রোগীরা স্থানীয় জনগণের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মৃতদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ। কঙ্গোর অনেক অঞ্চলে এখনো প্রচলিত রয়েছে ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে মৃতদেহ দাফনের সংস্কৃতি। কিন্তু ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তির মরদেহ অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দাফন করতে হয়। এতে অনেক সময় পরিবারকে মরদেহ স্পর্শ করতে দেয়া হয় না, এমনকি দাফন প্রক্রিয়াতেও সীমিত অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। আর এই বিষয়টিই স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করছে।

এর আগে এক সপ্তাহের ব্যবধানে রোয়ামপারা শহরের আরেকটি ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রেও হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে এক ব্যক্তির মৃত্যু ইবোলাজনিত বলে সন্দেহ করা হলে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে স্থানীয় বাসিন্দারা। পরবর্তীতে চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও হামলার চেষ্টা করা হয়।

গত শনিবার রোয়ামপারায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ইবোলা আক্রান্ত কয়েকজনের গণদাফন সম্পন্ন করা হয়। রেড ক্রসের টিম লিডার ডেভিড বাসিমা জানান, স্থানীয় কিছু যুবকের বাধা ও প্রতিরোধের মুখে তাদের কাজ পরিচালনা করতে হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তিনি বলেন, “মানুষের ভয় ও ক্ষোভ আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু ইবোলার মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যেই সতর্ক করে জানিয়েছে, ডিআরসিতে চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব বর্তমানে “অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি” তৈরি করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক সংক্রমণের ঝুঁকি কম বলে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবুও স্থানীয়ভাবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, রোগীদের পালিয়ে যাওয়া এবং জনগণের মধ্যে ভীতি ও অবিশ্বাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।

ইবোলা ভাইরাস আফ্রিকার জন্য নতুন কোনো সংকট নয়। গত দুই দশকে কঙ্গোতে একাধিকবার এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। প্রতিবারই শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ভাইরাসটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে ছড়ায়। জ্বর, দুর্বলতা, রক্তক্ষরণ এবং অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এর প্রধান উপসর্গ। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুহার অনেক বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঙ্গোর মতো সংঘাতপ্রবণ ও দরিদ্র অঞ্চলে ইবোলা নিয়ন্ত্রণ সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা, গুজব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি স্থানীয় মানুষের অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় মানুষ রোগ লুকিয়ে রাখে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে ভয় পায়। আবার অনেকে মনে করেন, বিদেশি স্বাস্থ্যকর্মীরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল নন।

বর্তমানে উত্তর-পূর্ব কঙ্গোর বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের জমায়েত সীমিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ৫০ জনের বেশি মানুষের সমাবেশ ও রাতভর শোকসভা নিষিদ্ধ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো থেকেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে, যাতে আক্রান্ত কেউ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যেতে না পারে।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই নতুন করে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম, সুরক্ষা পোশাক, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু চিকিৎসা সহায়তা নয়, জনগণের আস্থা অর্জন করাও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যেকোনো স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করা জরুরি। মানুষের সাংস্কৃতিক অনুভূতি, ধর্মীয় রীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।

এদিকে পালিয়ে যাওয়া ১৮ রোগীকে খুঁজে বের করতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথ অভিযান শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জনগণকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। কারণ ইবোলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে মহামারি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বলছে, ভয় ও অবিশ্বাস যখন স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে মিশে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এখন আন্তর্জাতিক সহায়তা, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে—এই নতুন ইবোলা সংকট কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com