প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক সংকট নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। খাদ্য, পানি এবং ত্রাণ সরবরাহ এখন আর কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয়, বরং এক ভয়াবহ যুদ্ধকৌশলের অংশে পরিণত হচ্ছে—যেখানে ক্ষুধাকে ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসেবে। সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গত আট বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ২০ হাজারেরও বেশি নথিবদ্ধ খাদ্য-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে ২৪১৭ নম্বর প্রস্তাব পাস করে, যেখানে বেসামরিক জনগণকে পরিকল্পিতভাবে ক্ষুধার্ত রাখাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেই আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্যকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা আরও বেড়েছে।
‘ইনসিকিউরিটি ইনসাইট’ নামের একটি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ১৫টি দেশে অন্তত ২১ হাজার ৪০৩টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে বাজার, গুদাম, কৃষিজমি এবং ত্রাণবাহী গাড়ির ওপর হামলা অন্যতম। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক হাজার ২৬১টি ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছে এবং ৮৬৩টি ঘটনায় খাদ্য বিতরণ কাঠামোর ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়েছে। এতে বহু ত্রাণকর্মী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্যকে লক্ষ্যবস্তু করা মানে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে দুর্বল ও নির্ভরশীল করে তোলা। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরা। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হতে বাধ্য হয়, যেখানে তারা আবারও সহিংসতার শিকার হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে। সেখানে একাই ৯ হাজারের বেশি খাদ্য-সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। ইয়েমেনে এই সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৩ এবং সুদানে ১ হাজার ৬০৫। এছাড়া সিরিয়ায় ১ হাজার ৫৩৮ এবং মালিতে ১ হাজার ৪১৫টি একই ধরনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায়ই সামরিক সংঘর্ষের কারণে ভেঙে পড়ছে।
সুদানের পশ্চিম কর্দোফানের ঘুবাইশ শহরের একটি ব্যস্ত বাজারে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় ২৮ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের হামলা কেবল প্রাণহানি ঘটায় না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকেও ধ্বংস করে দেয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফসলি জমিতে অন্তত ১ হাজার ৯০৯টি সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ৫৬৩টি গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে অন্তত ৪২টি দেশ ও অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পানি ও খাদ্য একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত শুধু ত্রাণ সংগ্রহ বা বিতরণের সময়েই ১০ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন। অনেক জায়গায় ত্রাণবাহী গাড়ি আটকে দেয়া হচ্ছে, কোথাও আবার সরাসরি বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গারসহ একাধিক সংস্থা বলছে, গাজা ও সুদানের মতো অঞ্চলগুলোতে দুর্ভিক্ষের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলেও বাস্তবে প্রতিদিনই অনাহার ও সহিংসতায় অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছেন, যাদের অনেক ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য-সহিংসতা এখন একটি সুসংগঠিত কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো কোনো পক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি লড়াইয়ের পরিবর্তে প্রতিপক্ষ জনগোষ্ঠীকে দুর্বল করার জন্য খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, বাজার ধ্বংস করে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাঙন তৈরি হয়, যা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর। খাদ্য সংকটের কারণে অনেক নারীকে দূরবর্তী ও অনিরাপদ এলাকায় খাবারের খোঁজে যেতে হচ্ছে, যেখানে তারা সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যরা যুদ্ধ বা বাস্তুচ্যুতির কারণে অনুপস্থিত থাকায় নারীরাই পরিবারের প্রধান দায়িত্ব পালন করছেন। শিশুদের জন্য এটি অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। যুদ্ধাপরাধ হিসেবে খাদ্য অবরোধ ও ত্রাণে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আরও কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী বছরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে খাদ্য-সহিংসতা যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে চলমান এই বাস্তবতা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের গল্প নয়, বরং কোটি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। খাদ্য যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন মানবতার ভবিষ্যৎও গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে।