দিল্লিতে ১১ দিনে চার দফা জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
দিল্লিতে ১১ দিনে চার দফা জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির প্রভাবে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে এটি চতুর্থ দফা মূল্যবৃদ্ধি, যা দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নতুন দফার এই বৃদ্ধির ফলে দিল্লিতে পেট্রোলের দাম ইতোমধ্যে লিটারপ্রতি ১০০ রুপির সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আর ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার (২৫ মে) পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২ রুপি ৬১ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ২ রুপি ৭১ পয়সা বাড়ানো হয়। এতে দিল্লিতে বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১০২ রুপি ১২ পয়সায় এবং ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৫ রুপি ২০ পয়সায়। এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি রাজধানীজুড়ে পরিবহন খাত থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

এর আগেও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক দফায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। সর্বশেষ বৃদ্ধির আগের দফায় শনিবার (২৩ মে) পেট্রোলের দাম ৮৭ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৯১ পয়সা বাড়ানো হয়। একই দিনে সিএনজির দামও কেজিপ্রতি ১ রুপি বাড়িয়ে ৮১ রুপি ৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। ফলে টানা মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রাক, বাস ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামও বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দুধ, পাউরুটি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন বাজারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমলেও ভারতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়া অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এলেও দিল্লিতে খুচরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দেশীয় বাজারে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি বিশেষ করে ইরান ও তার আশপাশের অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভারতের তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি—ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড—দীর্ঘদিন ধরে বাজারে স্থিতিশীল দাম বজায় রাখতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কোম্পানিগুলো প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে প্রায় এক হাজার কোটি রুপির বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল। ফলে সরকারের ওপর শেষ পর্যন্ত দাম সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব বহুমাত্রিক হয়। পরিবহন খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশে এই ধরনের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে।

জ্বালানি খাত বিশ্লেষক সৌরভ মিত্র বলেন, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে রুপির দুর্বল অবস্থানও আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা জ্বালানির দামে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল ছিল। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো বড় পরিবর্তন না এলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে সামান্য হ্রাস করা হয়েছিল। ফলে প্রায় চার বছর পর এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, সরকারের সময়মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার ওপর দেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।

সব মিলিয়ে দিল্লিতে জ্বালানির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু রাজধানীর অর্থনীতিকেই নয়, বরং পুরো দেশের বাজার ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট কত দ্রুত স্থিতিশীল হয় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত