থাইরয়েড রোগে পুষ্টির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
থাইরয়েড রোগে পুষ্টির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

থাইরয়েড রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সঠিক পুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে এই হরমোন স্বাভাবিক রাখতে খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক Shahjada Selim। তিনি বলেন, থাইরয়েড হরমোন তৈরি ও সক্রিয়করণের জন্য শরীরে নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান অত্যাবশ্যক। এসব উপাদানের ঘাটতি হলে থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনের মূল উপাদান হলো আয়োডিন। বাংলাদেশে একসময় আয়োডিনের ঘাটতি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কিছু অঞ্চলে এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে। আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি এবং সামুদ্রিক শৈবাল জাতীয় খাবারে এই উপাদান পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে যাদের অটোইমিউন থাইরয়েড সমস্যা রয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড হরমোন সক্রিয় করার ক্ষেত্রে সেলেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শরীরে থাইরক্সিন (T4) থেকে ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3)-এ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে থাইরয়েড গ্রন্থিকে প্রদাহ থেকে রক্ষা করে। ডিম, মাছ, বাদাম, বিশেষ করে ব্রাজিল নাট এবং ডাল সেলেনিয়ামের ভালো উৎস।

এছাড়া জিংকও থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিংকের ঘাটতি হলে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) ও অন্যান্য থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে যেতে পারে। মাংস, ডিম, দুধ, ডাল এবং বাদামে এই উপাদান পাওয়া যায়।

তবে কিছু খাবার থাইরয়েড কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এগুলোকে গয়ট্রোজেনিক খাবার বলা হয়। বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, সয়াবিন ও শালগম এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খাবার সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া প্রয়োজন নেই, তবে অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে বিশেষ করে অটোইমিউন রোগ যেমন হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস ও গ্রেভস ডিজিজে বেশি দেখা যায়। রোদ, ডিম, মাছ ও দুধ ভিটামিন ডি-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে আয়রনের ঘাটতি থাকলে থাইরয়েড হরমোন তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। লাল মাংস, কলিজা, পালংশাক ও ডাল আয়রনের ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত।

হাইপোথাইরয়েডিজমে খাদ্যাভ্যাস নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এই অবস্থায় কম ক্যালরি ও উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার গ্রহণ ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ, আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার এবং সেলেনিয়াম ও জিংকসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

থাইরয়েড রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TFT) করানো হলে রোগের অবস্থা বোঝা সহজ হয় এবং চিকিৎসা সময়মতো সমন্বয় করা যায়।

ডা. শাহজাদা সেলিম আরও বলেন, থাইরয়েড রোগীদের ওষুধ গ্রহণের সময়সূচি যথাযথভাবে মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ক্যালসিয়াম বা আয়রন সাপ্লিমেন্ট থাইরয়েড ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে, তাই এগুলো অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, “থাইরয়েড রোগ শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ—এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ থাইরয়েড সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সব মিলিয়ে, থাইরয়েড রোগে পুষ্টির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা শুধু চিকিৎসার অংশ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত