প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা শঙ্কা সত্ত্বেও এবারের হজ মৌসুমে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন বিপুল সংখ্যক মুসল্লি। সৌদি আরবের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ১৫ লাখেরও বেশি বিদেশি হজযাত্রী দেশটিতে পৌঁছেছেন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন থাকা সত্ত্বেও এই রেকর্ড সংখ্যক আগমনকে অনেকেই আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যায় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর। এরপর ধীরে ধীরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে, যার প্রভাব পড়ে আঞ্চলিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে। পরিস্থিতির জেরে এক পর্যায়ে আকাশপথে ভ্রমণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং কিছু রুটে ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পৌঁছাতে থাকেন। সৌদি আরবের হজ পাসপোর্ট বাহিনীর কমান্ডার Salih Al-Murabba জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বিদেশি হজযাত্রীর সংখ্যা ১৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫৩ জনে পৌঁছেছে, যা চলতি মৌসুমে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও হজযাত্রীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব অনেকের কাছেই সব বাধা অতিক্রম করে যায়। অনেক মুসল্লির কাছে হজ শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জীবনের একমাত্র বা শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ বা ভ্রমণ জটিলতা সত্ত্বেও তাঁরা সিদ্ধান্ত বদলাননি।
হজে অংশ নেওয়া এক মার্কিন নাগরিক ফাদেল বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেকে ভয় পেলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। তাঁর মতে, পবিত্র ভূমিতে উপস্থিত থাকা মানসিকভাবে এক ধরনের নিরাপত্তা ও প্রশান্তি দেয়। তিনি বলেন, “আমরা নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছি,” যা অনেক মুসল্লির অনুভূতির প্রতিফলন হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে হজযাত্রীদের যাতায়াতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে আকাশপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা যাত্রী আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যদিও সৌদি প্রশাসন এখন পর্যন্ত হজ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করার দাবি করছে।
হজ একটি অত্যন্ত বড় ও জটিল আন্তর্জাতিক ধর্মীয় আয়োজন, যেখানে প্রতি বছর বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। সৌদি সরকার প্রতিবছরই হজ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও প্রশাসন জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে আঞ্চলিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগে হজযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের কিছু বিমান সংস্থা সাময়িকভাবে ফ্লাইট বাতিল করলেও পরবর্তীতে তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংযোগের ক্ষেত্রও। এখানে রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষ একত্রিত হয়। তাই যেকোনো সংঘাতের সময়ও হজের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
এদিকে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে সৌদি প্রশাসন বিভিন্ন স্তরে কাজ করছে। ভিসা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিবহন ও আবাসন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি চিকিৎসা সেবায় আধুনিক ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান পরিস্থিতিতে হজ ব্যবস্থাপনা সফলভাবে সম্পন্ন করা সৌদি আরবের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপদ আগমন নিশ্চিত করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
হজযাত্রীরা বলছেন, যুদ্ধ বা ভয়াবহ সংবাদ তাদের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং ধর্মীয় আবেগ, আধ্যাত্মিক দায়িত্ববোধ এবং জীবনে একবার হলেও হজ পালনের ইচ্ছাই তাদের সৌদি আরবে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে এবারের হজ মৌসুম বিশ্ববাসীর কাছে এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা যে অটুট থাকে, তারই এক বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই বিপুল হজযাত্রা।